কুরআন ও কুরআনের মর্যাদা অনুধাবনের উপায়
কুরআন মাজীদকে বুঝতে হলে প্রারম্ভিক সুত্র হিসেবে এ কিতাব নিজে এবং এর উপস্থাপক হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে, মূল বিষয় বিবৃত করেছেন তা গ্রহন করতে হবে। এ মূল বিষয় নিম্নরূপ –
১। সমগ্র বিশ্ব জাহানের প্রভু, সৃষ্টিকর্তা, মালিক ও একচ্ছত্র শাসক সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যের অংশ বিশেষ এ পৃথিবীতে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তাঁকে দান করেছেন জানার, বুঝার ও চিন্তা করার ক্ষমতা। ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার, নির্বাচন, ইচ্ছা ও সংকল্প করার এবং নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করার স্বাধীনতা দান করেছেন। এক কথায় মানুষকে একধরনের স্বাধীনতা ( Autonomy ) দান করে তাঁকে দুনিয়ায় নিজের খলিফা বা প্রতিনিধি পদে অভিষিক্ত করেছেন।
২। মানুষকে এই পদে নিযুক্ত করার সময় বিশ্ব জাহানের প্রভু সর্বশক্তিমান আল্লাহ মানুষের মনে একথা দৃঢ় বদ্ধমূল করে দিয়েছিলেন- আমিই তোমাদের এবং সমগ্র সৃষ্টিলোকের একমাত্র মালিক, মা’বুদ ও প্রভু। আমার এই সাম্রাজ্যে তোমরা স্বাধীন স্বেচ্ছাচারী নও, কারোর অধীন নও এবং আমার ছাড়া আর কারোর তোমাদের বন্দেগী, পূজা ও আনুগত্য লাভের অধিকারও নেই। দুনিয়ার এই জীবনে তোমাদেরকে কিছু স্বাধীন ক্ষমতা-ইখতিয়ার দিয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি আসলে তোমাদের জন্যে পরীক্ষাকাল। এই পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলে তোমাদের আমার কাছে ফিরে আসতে হবে। তোমাদের কাজগুলো যাচাই বাছাই করে আমি সিদ্ধান্ত নেবো তোমাদের মধ্য থেকে কে সফল হলো এবং কে হলো ব্যর্থ। তোমাদের জন্যে সঠিক কর্মনীতি একটিই- তোমরা আমাকে মেনে নেবে তোমাদের একমাত্র মা’বুদ এবং শাসক হিসেবে। আমি তোমাদের জন্যে যে বিধান পাঠাবো সেই অনুযায়ী তোমরা দুনিয়ায় কাজ করবে। দুনিয়াকে পরীক্ষাগৃহ মনে করে এই চেতনা মোতাবেক জীবন যাপন করবে যেন আমার আদালতে শেষ বিচারে সফলকাম হওয়াই তোমাদের জীবনের আসল উদ্দেশ্য হয়। বিপরীত পক্ষে এর থেকে ভিন্নতর প্রত্যেকটি কর্মনীতি তোমাদের জন্যে ভুল এবং বিভ্রান্তিকর। প্রথম কর্মনীতিটি গ্রহন করলে ( যেটি গ্রহন করার পূর্ণ স্বাধীন ক্ষমতা তোমাদের দেয়া হয়েছে ) তোমরা দুনিয়ায় শান্তি, নিরাপত্তা এবং নিশ্চিন্ততা লাভ করবে। তারপর আমার কাছে ফিরে আসলে আমি তোমাদের দান করবো চিরন্তন আরাম ও আনন্দের আবাস জান্নাত। আর দ্বিতীয় কর্মনীতিটি গ্রহন করলে ( যেটি গ্রহন করার পূর্ণ স্বাধীন ক্ষমতা তোমাদের দেয়া হয়েছে ) তোমাদের দুনিয়ায় বিপর্যয় ও অস্থিরতার মুখোমুখি হতে হবে এবং দুনিয়ার জীবন শেষ করে আখিরাতে প্রবেশ কালে সেখানে জাহান্নাম নামক চিরন্তন মর্মজ্বালা, দুঃখ, কষ্ট ও বিপদের গভীর গর্তে তোমরা নিক্ষিপ্ত হবে।
৩। এ কথা ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়ার পর বিশ্ব জাহানের মালিক সর্বশক্তিমান আল্লাহ মানব জাতিকে পৃথিবীতে বসবাস করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। মানব জাতির দুই সদস্য ( আদম ও হাওয়া ) বিশিষ্ট প্রথম গ্রুপকে তিনি পৃথিবীতে জীবন যাপন করার জন্যে বিধান দান করেন। এই বিধান অনুযায়ী তাঁদের এবং তাঁদের সন্তান সন্তুতিদের দুনিয়ার সমস্ত কাজ কারবার চালিয়ে যেতে হবে। মানুষের এই প্রাথমিক বংশধরেরা মূর্খতা, অজ্ঞতা এবং অন্ধকারের মাঝে সৃষ্টি হননি। আল্লাহ পৃথিবীতে তাঁদের জীবন সূচনা করেন সম্পূর্ণ আলোর মধ্যে। তারা সত্যকে জানতেন। তাঁদেরকে জীবন বিধান ( ইসলাম ) দেয়া হয়েছিলো। আল্লাহর আনুগত্য ছিল তাঁদের জীবন পদ্ধতি। তারা তাঁদের সন্তানদেরকেও আল্লাহর আনুগত্য অনুযায়ী জীবন যাপন করতে শিখিয়ে গেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে শত শত বছরের জীবনাচরনে মানুষ ধীরে ধীরে এই সঠিক জীবন পদ্ধতি ( অর্থাৎ দ্বীন ) থেকে দূরে সরে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভুল কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করেছে। গাফলতির ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে একসময় তারা এই সঠিক জীবন পদ্ধতি হারিয়ে ফেলেছে। আবার শয়তানী প্ররোচনায় একে বিকৃতও করেছে। তারা পৃথিবী ও আকাশের মানবিক ও অমানবিক এবং কাল্পনিক ও বস্তুগত বিভিন্ন সত্ত্বাকে আল্লাহর সাথে তাঁর কাজ কারবারে শরীক করেছে। আল্লাহ প্রদত্ত যথার্থ জ্ঞানের ( আল ইলম ) মধ্যে বিভিন্ন প্রকার কল্পনা, ভাববাদ, মনগড়া মতবাদ ও দর্শনের মিশ্রন ঘটিয়ে তারা অসংখ্য ধর্মের সৃষ্টি করেছে। তারা আল্লাহ নির্ধারিত ন্যায়নিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ নৈতিক ও সাংস্কৃতিক নীতি ( শরীয়ত ) পরিহার বা বিকৃত করে নিজেদের প্রবৃত্তি, স্বার্থ ও ঝোঁক প্রবনতা অনুযায়ী জীবন যাপনের জন্যে নিজেরাই এমন বিধান তৈরি করেছে যার ফলে আল্লাহর এই যমীন জুলুম নিপীড়নে ভরে গেছে।
৪। আল্লাহ যদি তাঁর স্রষ্টাসুলভ ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিপথগামী মানুষদেরকে জোর পূর্বক সঠিক কর্মনীতি ও জীবনধারার দিকে ঘুরিয়ে দিতেন তাহলে তা হতো মানুষকে আল্লাহ প্রদত্ত সীমিত স্বাধীনতা দান নীতির পরিপন্থী। আবার এ ধরনের বিদ্রোহ দেখার সাথে সাথেই তিনি যদি মানুষকে ধংস করে দিতেন তাহলে সেটি হতো সমস্ত মানব জাতিকে পৃথিবীতে কাজ করার জন্যে তিনি যে সময় ও সুযোগ নির্ধারণ করে দিয়েছেন তাঁর সাথে অসামঞ্জস্যশীল। সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে তিনি যে দায়িত্বটি গ্রহন করেছিলেন সেটি ছিল এই যে, মানুষের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রেখে কাজের মাঝখানে যেসব সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে তাঁর মধ্য দিয়েই তিনি তাঁকে পথ নির্দেশনা দেয়ার ব্যবস্থা করবেন। কাজেই নিজের উপর আরোপিত দায়িত্ব পালনের জন্যে তিনি মানব জাতির মধ্য থেকে এমন একদল লোককে ব্যবহার করতে শুরু করেন যারা তাঁর উপর ঈমান রাখতেন এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে যেতেন। এদেরকে তিনি করেন নিজের প্রতিনিধি। এদের কাছে পাঠান নিজের অলংঘনীয় বানী। যথার্থ সত্য জ্ঞান এবং জীবন যাপনের সঠিক বিধান এদেরকে দান করে তিনি বনী আদমকে ভুল পথ থেকে এই সহজ সত্য পথের দিকে ফিরে আসার দাওয়াত দেয়ার জন্যে এদেরকে নিযুক্ত করেন।
৫। এরা ছিলেন আল্লাহর নবী। বিভিন্ন দেশে এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে আল্লাহ তাঁর নবী পাঠাতে থাকেন। হাজার হাজার বছর থেকে তাঁদের এ আগমনের সিলসিলা বা ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। তাঁদের সংখ্যা ছিল হাজার হাজার। তারা সবাই একই দীনের তথা জীবন পদ্ধতির অনুসারী ছিলেন। অর্থাৎ সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই মানুষকে যে সঠিক কর্মনীতির সাথে পরিচয় করানো হয়েছিলো তারা সবাই ছিলেন তাঁরই অনুসারী। তারা সবাই ছিলে একই হিদায়াতের প্রতি অনুগত। অর্থাৎ প্রথম দিন থেকেই মানুষের জন্যে নৈতিকতা এবং সমাজ সংস্কৃতির যে চিরন্তন নীতি নির্ধারণ করা হয়েছিলো তারা ছিলেন তাঁরই প্রতি অনুগত। তাঁদের সবার একই মিশন ছিল। অর্থাৎ তারা নিজেদের বংশধর, গোত্র ও জাতিকে এই দ্বীন ও হিদায়াতের দিকে আহবান জানান। তারপর যারা এ আহবান গ্রহন করে তাঁদেরকে সংগঠিত করে এমন একটি উম্মতে পরিনত করেন যারা নিজেরা হন আল্লাহর আইনের অনুগত এবং দুনিয়ায় আল্লাহর আইনের আনুগত্য কায়েম করার এবং তাঁর আইনের বিরুদ্ধচারন প্রবনতা প্রতিরোধ করার জন্যে প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালাতে থাকেন। এই নবীগন প্রত্যেকেই তাঁদের নিজেদের যুগে অত্যন্ত সুচারুরূপে এ মিশনের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সব সময় দেখা গেছে মানব গোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ তাঁদের দাওয়াত গ্রহন করতে প্রস্তুতই হয়নি। আর যারা এই দাওয়াত গ্রহন করে উম্মতে মুসলীমার অঙ্গীভূত হয় তাঁরাও ধীরে ধীরে নিজেরাই বিকৃতির সাগরে তলিয়ে যেতে থাকে। এমনকি তাঁদের কোন কোন উম্মত আল্লাহ প্রদত্ত হিদায়াত একেবারেই হারিয়ে ফেলে। আবার কেউ কেউ আল্লাহর বানীর সাথে নিজেদের কথার মিশ্রন ঘটিয়ে এবং তাঁর মধ্যে পরিবর্তন সাধন করে তাঁর চেহারাই বিকৃত করে দেয়।
৬। সব শেষে বিশ্ব জাহানের প্রভু সর্বশক্তিমান আল্লাহ আরব দেশে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠান। ইতোপূর্বে বিভিন্ন নবীকে যে দায়িত্ব দিয়ে তিনি দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপরও সেই একই দায়িত্ব অর্পণ করেন। সাধারন মানুষের সাথে সাথে পূর্বের নবীদের পথভ্রষ্ট উম্মতদেরকেও তিনি আল্লাহর দিকে আহবান জানান। সবাইকে সঠিক কর্মনীতি ও সঠিক পথ গ্রহনের দাওয়াত দেন। সবার কাছে নতুন করে আল্লাহর হিদায়াত পৌঁছে দেয়ার এবং এই দাওয়াত ও হিদায়াত গ্রহণকারীদেরকে এমন একটি উম্মতে পরিনত করাই ছিল তাঁর কাজ যারা একদিকে আল্লাহর হিদায়াতের উপর নিজেদের জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করবে এবং অন্য দিকে সমস্ত দুনিয়ায় সংশোধন ও সংস্কার সাধনের প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালাবে। এই দাওয়াত ও হিদায়াতের কিতাব হচ্ছে এই কুরআন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর মহান আল্লাহ এই কিতাবটি অবতীর্ণ করেন।
কুরআনের মূল আলোচ্য
কুরআন সম্পর্কিত এই মৌলিক ও প্রাথমিক কথাগুলো জেনে নেয়ার পর পাথকদের জন্যে এই কিতাবের বিষয়বস্তু, এর কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় ও লক্ষ্য বিন্দু সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভ করা সহজ হয়ে যায়।
এর বিষয়বস্তু মানুষ। প্রকৃত ও জাজ্বল্যমান সত্যের দৃষ্টিতে মানুষের কল্যাণ কিসে- এ কথাই কুরআনের মূল বিষয়বস্তু। এর কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় হচ্ছে এই যে, আপাত দৃষ্টি, আন্দাজ-অনুমান নির্ভরতা অথবা প্রবৃত্তির দাসত্ব করার কারনে মানুষ আল্লাহ, বিশ্ব জাহানের ব্যবস্থাপনা, নিজের অস্তিত্ব ও নিজের পার্থিব জীবন সম্পর্কে যেসব মনগড়া মতবাদ গড়ে তুলেছে এবং ঐ মতবাদগুলোর উপর ভিত্তি করে যে দৃষ্টিভংগী ও কর্মনীতি অবলম্বন করেছে যথার্থ জাজ্বল্যমান সত্যের দৃষ্টিতে তা সবই ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ এবং পরিনতির দিক দিয়ে তা মানুষের জন্যে ধংসকর। আসল সত্য তাই যা মানুষকে খলীফা হিসেবে নিযুক্ত করার সময় আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছিলেন। আর এই আসল সত্যের দৃষ্টিতে মানুষের জন্যে ইতোপূর্বে সঠিক কর্মনীতি নামে যে দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মনীতির আলোচনা করা হয়েছে তাই সঠিক, নির্ভুল ও শুভ পরিনতির দাবীদার।
এর চূড়ান্ত লক্ষ্য ও বক্তব্য হচ্ছে, মানুষকে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মনীতি অবলম্বনের প্রতি আহবান জানানো এবং আল্লাহর হিদায়াতকে দ্ব্যর্থহীনভাবে পেশ করা। মানুষ নিজের গাফলতি ও অসতর্কতার দরুন এগুলো হারিয়ে ফেলেছে এবং তাঁর শয়তানী প্রবৃত্তির কারনে সে এগুলোকে বিভিন্ন সময়ে বিকৃত করার কাজই করে এসেছে। এই তিনটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রেখে কুরআন পাঠ করতে থাকলে দেখা যাবে এই কিতাবটি তাঁর সমস্ত পরিসরে কোথাও তাঁর বিষয়বস্তু, কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় এবং মূল লক্ষ্য ও বক্তব্য থেকে এক চুল পরিমাণও সরে পড়েনি। প্রথম থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর বিভিন্ন ধরনের বিষয়াবলী তাঁর কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়ের সাথে এমনভাবে সংযুক্ত আছে যেমনভাবে একটি মোতির মালার বিভিন্ন রঙের ছোট বড় মোতি একটি সুতোর বাঁধনে একসাথে, একত্রে একটি নিবিড় সম্পর্কে গাঁথা থাকে। কুরআনে আলোচনা করা হয় পৃথিবী ও আকাশের গঠনাকৃতির, মানুষ সৃষ্টির প্রক্রিয়া-পদ্ধতি এবং বিশ্ব জগতের নিদর্শন সমূহ পর্যবেক্ষণের ও অতীতের বিভিন্ন জাতির ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর। কুর্বানে বিভিন্ন জাতির আকীদা বিশ্বাস, নৈতিক চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা হয়। অতি প্রাকৃতিক বিষয়াবলীর ব্যাখ্যা করা হয়। এই সাথে অন্যান্য আরো বহু জিনিসের উল্লেখও করা হয়। কিন্তু মানুষকে পদার্থ বিদ্যা, জীব বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন বা অন্য কোন বিদ্যা শিক্ষা দেয়ার জন্যে কুর্বানে এগুলো আলোচনা করা হয়নি। বরং প্রকৃত ও জাজ্বল্যমান সত্য সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারনা দূর করা, যথার্থ সত্যটি মানুষের মনের মাঝে গেঁথে দেয়া, যথার্থ সত্য বিরোধী কর্মনীতির ভ্রান্তি ও অশুভ পরিনতি সুস্পষ্ট করা তুলে ধরা এবং সত্যের অনুরূপ ও শুভ পরিনতির অধিকারী কর্মনীতির দিকে মানুষকে আহবান করাই এর উদ্দেশ্য। এ কারনে এতে প্রতিটি বিষয়ের আলোচনা কেবলমাত্র ততটুকুই এবং সেই ভঙ্গিমায় করা হয়েছে যতটুকু এবং যে ভঙ্গিমায় আলোচনা করা হয় তাঁর মূল লক্ষ্যের জন্যে প্রয়োজন। প্রয়োজন মতো এসব বিষয়ের আলোচনা করার পর কুরআন সব সময় অপ্রয়োজনীয় বিস্তারিত আলোচনা বাদ দিয়ে নিজের উদ্দেশ্য ও কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়ের দিকে ফিরে এসেছে। একটি সুগভীর ঐক্য ও একাত্মতা সহকারে তাঁর সমস্ত আলোচনা ‘ইসলামী দাওয়াতের’ কেন্দ্রবিন্দুতে ঘুরছে———–।
কুরআন অধ্যয়নের পদ্ধতি
কুরআন একটি অসাধারন গ্রন্থ। দুনিয়ার অসংখ্য মানুষ অসংখ্য উদ্দেশ্য নিয়ে কুরআনের দিকে এগিয়ে আসে। এদের সবার প্রয়োজন ও উদ্দেশ্যের প্রতি দৃষ্টি রেখে কোন পরামর্শ দেয়া মানুষের পক্ষে সম্ভবপর নয়। এই বিপুল সংখ্যক অনুসন্ধানীদের মধ্যে যারা একে বুঝতে চান এবং এ কিতাবটি মানুষের জীবন সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে কোন ধরনের ভুমিকা পালন করে এবং তাঁকে কিভাবে পথ দেখায়- একথা জানতে চান- আমি কেবল তাঁদের ব্যাপারেই আগ্রহী। এই ধরনের লোকদের কুরআন অধ্যয়নের পদ্ধতি সম্পর্কে আমি এখানে কিছু পরামর্শ দেবো। আর এই সংগে সাধারন লোকেরা এ ব্যাপারে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয় তারও সমাধান করার চেষ্টা করবো। কোন ব্যক্তি কুরআনের উপর ঈমান রাখুন আর নাই রাখুন তিনি যদি এই কিতাবকে বুঝতে চান তাহলে সর্বপ্রথম তাঁকে তাঁর নিজের মন- মস্তিষ্ককে পূর্ব প্রতিষ্ঠিত চিন্তাধারা ও মতবাদ এবং অনুকূল – প্রতিকুল উদ্দেশ্য ও স্বার্থ চিন্তা থেকে যথাসম্ভব মুক্ত করতে হবে। এ কিতাবটি বুঝার ও হৃদয়ঙ্গম করার নির্ভেজাল ও আন্তরিক উদ্দেশ্য নিয়ে এর অধ্যয়ন শুরু করতে হবে। যারা মনের মধ্যে বিশেষ ধরনের চিন্তাধারা পূর্বে রেখে এ কিতাবটি পড়েন তারা এর বিভিন্ন ছত্রের মাঝখানে নিজেদের চিন্তাধারাই পড়ে যেতে থাকেন। আসল কুরআনের সামান্য বাতাসটুকুও তাঁদের গায়ে লাগেনা। দুনিয়ার যেকোন বই পড়ার ব্যাপারেও এ ধরনের অধ্যয়ন রীতি ঠিক নয়। আর বিশেষ করে কুরআন তো এই ধরনের পাঠকদের জন্যে তাঁর অন্তর্নিহিত সত্য ও গভীর তাৎপর্যময় অর্থের দুয়ার কখনোই উন্মুক্ত করে না।
তারপর যে ব্যক্তি কুরআন সম্পর্কে ভাসাভাসা জ্ঞান লাভ করতে চায় তাঁর জন্য সম্ভবত একবার পড়ে নেয়াই যথেষ্ট। কিন্তু যে এর অর্থের গভীরে নামতে চায় তাঁর জন্যে তো দুইবার পড়ে নেয়াও যথেষ্ট হতে পারে না। অবশ্যই তাঁকে বার বার পড়তে হবে। প্রতি বার একটি নতুন ভংগিমায় পড়তে হবে। একজন ছাত্রের মতো পেন্সিল ও নোট বই সাথে নিয়ে বসতে হবে। জায়গা মতো প্রয়োজনীয় বিষয় নোট করতে হবে। এভাবে যারা কুরআন পড়তে প্রস্তুত হবে, কুরআন যে চিন্তা ও কর্মধারা উপস্থাপন করতে চায় তাঁর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনটা যেন তাঁদের সামনে ভেসে উঠে- কেবলমাত্র এই উদ্দেশ্যেই তাঁদের অন্ততপক্ষে দুইবার এই কিতাবটি পড়তে হবে। এই প্রাথমিক অধ্যয়নের সময় তাঁদের কুরআনের সমগ্র বিষয়বস্তুর ওপর ব্যাপক ভিত্তিক জ্ঞান লাভ করার চেষ্টা করতে হবে। তাঁদের দেখতে হবে, এই কিতাবটি কোন কোন মৌলিক চিন্তা পেশ করে এবং সে চিন্তাধারার উপর কিভাবে জীবন ব্যবস্থার অট্টালিকার ভিত গড়ে তোলে? এ সময়কালে কোন জায়গায় তাঁর মনে যদি কোন প্রশ্ন জাগে বা কোন খটকা লাগে, তাহলে তখনি সেখানেই সেসম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে বরং সেটি নোট করে নিতে হবে এবং ধৈর্যসহকারে সামনের দিকে অধ্যয়ন জারী রাখতে হবে। সামনের দিকে কোথাও না কোথাও তিনি এর জবাব পেয়ে যাবেন, এরি সম্ভাবনা বেশী। জবাব পেয়ে গেলে নিজের প্রশ্নের পাশাপাশি সেটি নোট করে নেবেন। কিন্তু প্রথম অধ্যয়নের পর নিজের কোন প্রশ্নের জবাব না পেলে ধৈর্য সহকারে দ্বিতীয় বার অধ্যয়ন করতে হবে। আমি নিজের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, দ্বিতীয় বার গভীর মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করার পর কালেভদ্রে কোন প্রশ্নের জবাব অনুদঘাটিত থেকে গেছে।
এভাবে কুরআন সম্পর্কে একটি ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গী লাভ করার পর এর বিস্তারিত অধ্যয়ন শুরু করতে হবে। এ প্রসঙ্গে পাঠককে অবশ্যি কুরআনের শিক্ষার এক একটি দিক পূর্ণরূপে অনুধাবন করার পর নোট করে নিতে হবে। যেমন মানবতার কোন ধরনের আদর্শকে কুরআন পসন্দনীয় গণ্য করেছে অথবা মানবতার কোন ধরনের আদর্শ তাঁর কাছে ঘৃণার্হ এবং প্রত্যাখ্যাত এ কথা তাঁকে বুঝার চেষ্টা করতে হবে। এ বিষয়টিকে ভালোভাবে নিজের মনের মধ্যে গেঁথে নেয়ার জন্যে তাঁকে নিজের নোট বুকের মধ্যে একদিকেলিখতে হবে ‘পসন্দনীয় মানুষ’ আবার আওন্নদিকে লিখতে হবে ‘অপসন্দনীয় মানুষ’ এবং উভয়ের নীচে তাঁদের গুনাবলী ও বৈশিষ্ট্য লিখতে রাখতে হবে। অথবা যেমন, তাঁকে জানার চেষ্টা করতে হবে, কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষের কল্যাণ ও মুক্তি কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভরশীল এবং কোন কোন জিনিসকে সে মানবতার জন্যে ক্ষতিকর ও ধংসাত্নক গণ্য করে – এ বিষয়টিকেও সুস্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে জানার জন্যে আগের পদ্ধতিই অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ নোট বইতে কল্যাণের জন্য ‘অপরিহার্য বিষয় সমূহ’ এবং ক্ষতির জন্য ‘অনিবার্য বিষয় সমূহ’ – এই শিরোনাম দুটি পাশাপাশি লিখতে হবে। অতঃপর প্রতিদিন কুরআন অধ্যয়ন করার সময় সংশ্লিষ্ট বিষয় দুটি সম্পর্কে নোট করে যেতে হবে। এ পদ্ধতিতে আকীদাহ-বিশ্বাস, চরিত্র-নৈতিকতা, অধিকার, কর্তব্য, সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, দলীয় সংগঠন- শৃঙ্খলা, যুদ্ধ, সন্ধি এবং জীবনের অন্যান্য বিষয়াবলী সম্পর্কে কুরআনের বিধান নোট করতে হবে এবং এর প্রতি বিভাগের সামগ্রিক চেহারা কী দাড়ায়, তারপর এগুলোকে একসাথে মেলালে কোন ধরনের জীবন চিত্র ফুটে ওঠে, তা অনুধাবন করার চেষ্টা করতে হবে। আবার জীবনের বিশেষ কোন সমস্যার ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাতে হলে এবং সে ব্যাপারে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে হলে সেই সমস্যা সম্পর্কিত প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্য গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হবে। এই অধ্যয়নের মাধ্যমে তাঁকে সংশ্লিষ্ট সমস্যার মৌলিক বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে জেনে নিতে হবে। মানুষ আজ পর্যন্ত সে সম্পর্কে কি কি চিন্তা করেছে এবং তাঁকে কিভাবে অনুধাবন করেছে? কোন কোন বিষয় এখনো সেখানে সমাধানের অপেক্ষায় আছে? মানুষের চিন্তার গাড়ি কোথায় গিয়ে আটকে গেছে? এই সমাধানযোগ্য সমস্যা ও বিষয়গুলোকে সামনে রেখেই কুরআন অধ্যয়ন করতে হবে। কোন বিষয় সম্পর্কে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি জানার এতিই সবচেয়ে ভালো এবং সুন্দর পথ। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, এভাবে কোন বিষয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে অধ্যয়ন করতে থাকলে এমন সব আয়াতের মধ্যে নিজের প্রশ্নের উত্তর পাওয়ায় যাবে, যেগুলো ইতোপূর্বে কয়েকবার পড়া হয়ে থাকলেও এই তত্ত্ব সেখানে লুকিয়ে আছে একথা ঘুনাক্ষরেও মনে জাগে নি।
কুরআনের প্রানসত্তা অনুধাবন
কিন্তু কুরআন বুঝার এই সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যে কাজ করার বিধান ও নির্দেশ নিয়ে কুরআন এসেছে কার্যত ও বাস্তবে তা না করা পর্যন্ত কোন ব্যক্তি কুরআনের প্রানসত্তার সাথে পুরোপুরি পরিচিত হতে পারেনা। এটা নিছক কোন মতবাদ বা চিন্তাধারার বই নয়। কাজেই আরাম কেদারায় বসে বসে এ বইটি পড়লে এর সব কথা বুঝতে পারা যাবার কথা নয়। দুনিয়ার প্রচলিত ধর্ম চিন্তা অনুযায়ী এটি নিছক একটি ধর্ম গ্রন্থও নয়। মাদ্রাসায় ও খানকায় বসে এর সমস্ত রহস্য ও গভীর তত্ত্ব উদ্ধার করাও সম্ভব নয়। শুরুতে ভুমিকায় বলা হয়েছে, এটি একটি দাওয়াত এবং আন্দোলনের কিতাব। সে এসেই এক নিরব প্রকৃতির সৎ ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিকে নির্জন ও নিঃসংগ জীবন ক্ষেত্র থেকে বের করে এনে আল্লাহ বিরোধী দুনিয়ার মোকাবেলায় দাড় করিয়ে দিয়েছে। তাঁর কণ্ঠে যুগিয়েছে বাতিলের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদের ধ্বনি। যুগের কুফরী, ফাসেকী ও ভ্রষ্টতার পতাকাবাহীদের বিরুদ্ধে তাঁকে প্রচণ্ড সংঘর্ষে লিপ্ত করেছে। সচ্চরিত্র সম্পন্ন সত্যনিষ্ঠ লোকদেরকে প্রতিটি গ্রহান্তর থেকে খুঁজে বের করে এনে সত্যের আহবায়কের পতাকাতলে সমবেত করেছে। দেশের প্রতিটি এলাকার ফিতনাবাজ ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত করে সত্যানুসারীদের সাথে তাঁদের যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছে। এক ব্যক্তির আহবানের মাধ্যমে নিজের কাজ শুরু করে খিলাফতে ইলাহিয়ার প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত পূর্ণ তেইশ বছর এই কিতাবটি এই বিরাট ও মহান ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করেছে। হক ও বাতিলের এই সুদীর্ঘ এবং প্রানান্তকর সংঘর্ষকালে প্রতিটি মঞ্জিল ও প্রতিটি পর্যায়েই সে একদিকে ভাংগার পদ্ধতি শিখিয়েছে এবং অন্যদিকে পেশ করেছে গড়ার নকশা। এখন বলুন, যদি আপনি ইসলাম ও জাহেলিয়াত এবং দ্বীন ও কুফরীর সংগ্রামে অংশগ্রহণই না করেন, যদি এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মনযিল অতিক্রম করার সুযোগই আপনার না ঘটে, তাহলে নিছক কুরআনের শব্দগুলো পাঠ করলে তাঁর সমুদয় তত্ত্ব কেমন করে আপনার সামনে উদ্ঘাটিত হয়ে যাবে? কুরআনকে পুরোপুরি অনুধাবন করা তখনই সম্ভব হবে যখন আপনি নিজেই কুরআনের দাওয়াত নিয়ে উঠবেন, মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করার কাজ শুরু করবেন এবং এই কিতাব যেভাবে পথ দেখায় সেভাবেই পদক্ষেপ নিতে থাকবেন। একমাত্র তখনই, কুরআন নাযীলের সময়কালীন অভিজ্ঞতাগুলো আপনি লাভ করতে সক্ষম হবেন। মক্কা ও হাবশা ( বর্তমান ইথিওপিয়া ও তায়েফের মনজিলও আপনি দেখাবেন ) বদর ও উহুদ থেকে শুরু করে হুনাইন ও তাবুক পর্যন্ত মনজিল আপনার সামনে এসে যাবে। আপনি আবু জেহেল ও আবু লাহাবের মুখোমুখি হবেন। মুনাফিক ও ইহুদীদের সাক্ষাতও আপনি পাবেন। ইসলামের প্রথম যুগের উৎসর্গিত প্রান মুমিন থেকে নিয়ে দুর্বল হৃদয়ের মুমিন পর্যন্ত সবার সাথেই আপনার দেখা হবে। এটা এক ধরনের ‘সাধনা’। একে আমি বলি ‘কুরআনী সাধনা’। এই সাধনা পথে ফুটে ওঠে এক অভিনব দৃশ্য। এর যতগুলো মনযিল অতিক্রম করতে থাকবেন তাঁর প্রতিটি মনযিলে কুরআনের কিছু আয়াত ও সূরা আপনা আপনি আপনার সামনে এসে যাবে। তারা আপনাকে বলতে থাকবে – এই মনযিলে তারা অবতীর্ণ হয়েছিলো এবং সেখানে এই বিধানগুলো এনেছিল। সে সময় অভিধান, ব্যাকরন ও অলংকার শাস্ত্রীয় কিছু তত্ত্ব সাধকের দৃষ্টির অগোচরে থেকে যেতে পারে কিন্তু কুরআনের নিজের প্রানসত্তাকে তাঁর সামনে উন্মুক্ত করতে কার্পণ্য করবে, এমনটি কখনো হতে পারে না।
আবার এই সাধারন নিয়ম অনুযায়ী মানুষ ততক্ষন পর্যন্ত কুরআনের বিধানসমুহ, তাঁর নৈতিক শিক্ষাবলী, তাঁর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিধি বিধান এবং জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ সম্পর্কে তাঁর প্রনীত নীতি নিয়ম- ও আইনসমূহ বুঝতে পারবে না যতক্ষন না সে নিজের বাস্তব জীবনে এগুলো কার্যকর করে দেখবে। যে ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনে কুরআনের অনুসৃতি নেই সে তাঁকে বুঝতে পারবে না। আর যে জাতির সমস্ত সামাজিক প্রতিষ্ঠান কুরআন বিবৃত পথ ও কর্মনীতির বিপরীত দিকে চলে তাঁর পক্ষেও এসবের সাথে পরিচিত হয়ে সম্ভবপর নয়।
কুরআনী দাওয়াতের বিশ্বজনীনতা
কুরআন সমগ্র বিশ্ব মানবতাকে পথ দেখাবার দাবী নিয়ে এগিয়ে এসেছে, এ কথা সবাই জানে। কিন্তু কুরআন পড়তে বসেই কোন ব্যক্তি দেখতে পায়, সে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁর নাযিল হওয়ার সমকালীন আরববাসীদেরকে লক্ষ্য করেই তাঁর বক্তব্য পেশ করেছে। তবে কখনো কখনো মানব জাতি ও সাধারন মানুষকেও সম্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে এমন সব কথা বলে যা আরববাসীদের রুচি-অভিরুচি, আরবের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, ইতিহাস ও রাজনীতির সাথেই সম্পর্কিত। এসব দেখে এক ব্যক্তি চিন্তা করতে থাকে, সমগ্র মানব জাতিকে পথ দেখাবার জন্যে যে কিতাবটি অবতীর্ণ হয়েছিলো তাঁর মধ্যে সাময়িক, স্থানীয় ও জাতীয় বিষয়সমূহ ও উপাদান এতো বেশী কেন? এ বিষয়টির তাৎপর্য অনুধাবন না করার কারনে অনেকের মনে সন্দেহ জাগে ; তারা মনে করেন, সম্ভবত এ কিতাবটি সমকালীন আরববাসীদের সংশোধন ও সংস্কারের জন্যে অবতীর্ণ হয়েছিলো কিন্তু পরবর্তীকালে জোর পূর্বক টানা হেঁচড়া করে তাঁকে চিরন্তনভাবে সমগ্র মানব জাতির জন্য জীবন বিধান রূপে গণ্য করা হয়েছে।
যে ব্যক্তি নিছক অভিযোগ হিসেবে নয় বরং বাস্তবে কুরআন বুঝার জন্যে এ ধরনের অভিযোগ আনেন তাঁকে আমি একটি পরামর্শ দেবো। প্রথমে কুরআন পড়ার সময় সেই সব স্থানগুলো একটু দাগিয়ে রাখুন যেখানে কুরআন কেবলমাত্র আরবদের জন্য এবং প্রকৃত পক্ষে স্থান, কাল ও সময় ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ এমন আকীদা- বিশ্বাস, চিন্তা বা ভাবধারা অথবা নৈতিক বিধান বা কার্যকর নিয়ম কানুন উপস্থাপন করা হয়েছে। কুরআন একটি বিশেষ স্থানে একটি বিশেষ যুগের লোকদেরকে সম্বোধন করে তাঁদের মুশরীকি বিশ্বাস ও রীতি নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এবং তাঁদের আসে পাশের জিনিসগুলোকে ভিত্তি করে তাওহীদের পক্ষে যুক্তি ও প্রমান দাড় করায়- নিছক এতোটুকু কথার ভিত্তিতে কুরআনের দাওয়াত ও তাঁর আবেদন স্থানীয় ও সাময়িক- এ কথা বলা যথেষ্ট হবে না। এ ক্ষেত্রে দেখতে হবে, শিরকের প্রতিবাদে সে যা কিছু বলে তা কি দুনিয়ার অন্যান্য প্রতিটি শিরকের ব্যাপারে ঠিক তেমনিভাবে খাপ খেয়ে যায় না যেমন আরবের মুশরিকদের শিরকের সাথে খাপ খেয়ে গিয়েছিলো? সেই একই যুক্তি প্রমাণগুলোকে কি আমরা প্রতিটি যুগের ও প্রতিটি দেশের মুশরিকদের চিন্তার পরিশুদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারি না? আর তাওহীদের প্রমান ও প্রতিষ্ঠার জন্য কুরআনী প্রমা পদ্ধতিকে কি সামান্য রদবদল করে সব সময় ও সব জায়গায় কাজে লাগানো যেতে পারে না? জবাব যদি ইতবাচক হয়ে থাকে, তাহলে একটি বিশ্বজনীন শিক্ষা কেবলমাত্র একটি বিশেষ কালে একটি বিশেষ জাতিকে সম্বোধন করা দান করা হয়েছিলো বলেই তাঁকে স্থানীয় ও সাময়িক বলার কোন কারণই থাকতে পারে না। দুনিয়ার এমন কোন দর্শন, জীবন- ব্যবস্থা ও চিন্তা দর্শন নেই যার প্রথম থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত সমস্ত কথাই বস্তু নিরপেক্ষ ( Abstract ) বর্ণনা ভংগিতে পেশ করা হয়েছে। বরং কোন একটি বিশেষ অবস্থা বা পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে তাঁর ব্যাখ্যা দান করা হয়েছে। এ ধরনের পূর্ণ বস্তু নিরপেক্ষতা সম্ভন নয়। আর সম্ভন হলেও তা নিছক কাজীর গরুর মতো খাতাপত্রেই থাকবে, গোয়ালে তাঁর নাম নিশানাও দেখা যাবে না। কাজেই মানুষের জীবনের সাথে সংযুক্ত হয়ে তাঁর পক্ষে কোন বাস্তব বিধানের রূপ নেয়া কোন দিনই সম্ভব হবে না।
তাছাড়া কোন চিন্তামূলক, নৈতিক, আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্প্রসারিত করতে চাইলে তাঁর জন্যে আদৌ এর কোন প্রয়োজন নেই। বরং যথার্থই বলতে হয়, শুরু থেকেই তাঁকে আন্তর্জাতিক বানাবার চেষ্টা করা তাঁর জন্য কল্যাণকরও নয়। আসলে তাঁর জন্য সঠিক ও বাস্তব সম্মত পন্থা একটিই। এই আন্দোলনটি যেসব চিন্তাধারা, মতবাদ ও মুলনীতির ভিত্তিতে মানুষের জীবনের ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাঁকে পূর্ণ শক্তিতে সেই দেশেই প্রবেশ করতে হবে যেখান থেকে তাঁর দাওয়াতের সূচনা হয়েছে। সেই দেশের লোকদের মনে এই দাওয়াতের তাৎপর্য অঙ্কিত করে দিতে হবে, যাদের ভাষা, স্বভাব, প্রকৃতি, অভ্যাস ও আচরনের সাথে আন্দোলনের আহবায়ক নিজে সুপরিচিত। তারপর তাঁকে নিজের দেশেই ঐ মূলনীতিগুলো বাস্তবায়িত করে তাঁর ভিত্তিতে একটি সফল জীবন ব্যবস্থা পরিচালনার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে আদর্শ স্থাপন করতে হবে। তবেই তো দুনিয়ার অন্যান্য জাতিরা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হবে। তাঁদের বুদ্ধিজীবী শ্রেণী স্বতঃস্ফ্রুতভাবে এগিয়ে এসে তাঁকে অনুধাবন করতে ও নিজের দেশে প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হবে। কাজেই কোন চিন্তা ও কর্মব্যবস্থাকে প্রথমে শুধুমাত্র একটি জাতির সামনে পেশ করা হয়েছিলো এবং কেবলমাত্র তাদেরকেই বুঝাবার ও নিশ্চিন্ত করার জন্য যুক্তি প্রদর্শনের পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করা হয়েছিল বলেই তা একটি নিছক জাতীয় দাওয়াত ও আন্দোলন- একথা বলার পেছনে কোন যুক্তি নেই। প্রকৃতপক্ষে একটি জাতীয় ও একটি আন্তর্জাতিক এবং একটি সাময়িক ও একটি চিরন্তন ব্যবস্থার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তার বিশেষত্বগুলোকে নিম্নোক্তভাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে-
জাতীয় ব্যবস্থা হয় একটি জাতির শ্রেষ্ঠত্ব, আধিপত্য বা তাঁর বিশেষ অধিকারসমূহের দাবীদার। অথবা তাঁর নিজের মধ্যে এমন কিছু নীতি ও মতাদর্শ থাকে যা অন্যান্য জাতির মধ্যে ঠাই পেতে পারে না। বিপরীত পক্ষে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সকল মানুষের মর্যাদা হয় সমান, তাঁদের সমান অধিকার দিতেও সে প্রস্তুত হয় এবং তাঁর নীতিগুলোর মধ্যেও বিশ্বজনীনতার সন্ধান পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে একটি সাময়িক ব্যবস্থা অবশ্যি এমন কিছু নীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় যেগুলো কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে তাঁর সমস্ত কার্যক্রম হারিয়ে ফেলে। আর এর বিপরীত পক্ষে একটি চিরন্তন ব্যবস্থার নীতিগুলো সব রকমের পরিবর্তিত অবস্থার সাথে খাপ খেয়ে চলে। এই বিশিষ্টগুলো দৃষ্টির সামনে রেখে যদি কোন ব্যক্তি কুরআন অধ্যয়ন করেন বা বিষয়গুলোর কারনে সত্যি সত্যিই কুরআন উপস্থাপিত ব্যবস্থাকে সামটিক বা জাতীয় হবার ধারনা পোষণ করা যেতে পারে তা নির্ধারণ করার চেষ্টা করেন, তাহলে তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ হবেন, এতে সন্দেহ নেই।
Your Title Goes Here
Your content goes here. Edit or remove this text inline or in the module Content settings. You can also style every aspect of this content in the module Design settings and even apply custom CSS to this text in the module Advanced settings.
সুমধুর সুরে কুরআন পাঠ সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে
৬৪। হযরত বারাআ ইবনে আযেব (রাঃ ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়আ সাল্লামকে বলতে শুনেছি- তোমরা নিজেদের উত্তম কণ্ঠস্বর দ্বারা কুরআনকে সৌন্দর্য মণ্ডিত করো। কেননা সুমধুর স্বর কুরআনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। ———— ( দারেমী )
এ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি হাদীস এসেছে। কোনটিতে যদি গানের সুরে কুরআন পড়তে বাঁধা দেয়া হয়েছে তাহলে অপরটিতে তা সুমধুর কণ্ঠে পাঠ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে জানআ গেলো, গানের সুরে পড়া এবং সুমিষ্ট আওয়াজে পড়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, একটি পসন্দনীয় আর অপরটি অপসন্দনীয়।
সুকণ্ঠে কুরআন পড়ার অর্থ কি
৬৫। হযরত তাউস ইয়েমেনী মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হল, কোন ব্যক্তি কুরআনকে উত্তম স্বরে উত্তম পন্থায় পাঠকারী? তিনি বললেন- যে ব্যক্তির কুরআন পাঠ শুনে তোমার এমন ধারনা হবে যে, আল্লাহকে ভয় করছে। ——— ( দারেমী )
দেখুন, এখানে সুকণ্ঠে কুরআন পাঠ করার অর্থকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিভাবে পরিস্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তিনি যখন বললেন- কুরআনকে সুমধুর আওয়াজ দ্বারা সৌন্দর্য মণ্ডিত করো এবং তা সুমিষ্ট স্বরে পাঠ করো, কিন্তু গানের সুরে পড়না- তখন লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, সুমিষ্ট স্বরে কুরআন পাঠ করার অর্থ কি? এরপর তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন- কুরআনকে এমন ভঙ্গীতে পাঠ করো যেন শ্রোতা স্বয়ং অনুভব করতে পারে যে, তুমি খদাকে ভয় করছ। খোদার ভয়শূন্য হয়ে মানুষ যখন কুরআন পাঠ করে তখন তাঁর অবস্থা ভিন্নরূপ হয়ে থাকে। আর যে ব্যক্তি কুরআনকে হৃদয়ঙ্গম করে এবং খোদার ভয় জাগ্রত রেখে পাঠ করে তাঁর অবস্থা হবে অন্যরকম। যে প্রতিটি জিনিসের প্রভাবকে গ্রহন করে কুরআন পাঠ করে। তাঁর পাঠের ধরন এবং মুখের ভংগি থেকেই তাঁর এই খোদাভীতির প্রকাশ ঘটে।
কুরআনকে পরকালীন মুক্তির উপায় বানাও
৬৬। হযরত আবীদাহ মুলাইকী ( রাঃ ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ হে আহলে কুরআন, ( কুরআন পাঠকারীগণ) কুরআনকে কখনো বালিশ বানাবে না, বরং দিনরাত তা পাঠ করবে। যেভাবে পাঠ করলে এর হক আদায় হয়- সেভাবে পাঠ করবে। তা প্রকাশ্যভাবে এবং সুললিত কণ্ঠে পাঠ করবে। এর মধ্যে যেসব বিষয় আলোচিত হয়েছে তা নিয়ে গভীরভাবে চিনাত- ভাবনা করবে। আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে। তাঁর সওয়াব দ্রুত লাভ করার চেষ্টা করোনা। কেননা এর সওয়াব ( আখেরাতে ) অবশ্যই পাওয়া যাবে। –( বায়হাকী )
বলা হয়েছে- ‘কুরআনকে বালিশে পরিনত করো না’। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, মানুষ যেভাবে বালিশের উপর মাথা রেখে শোয়ার জন্য লম্বা হয়ে পড়ে যায়—অনুরূপভাবে কুরআনকে বালিশের বিকল্প বানিয়ে তাঁর উপর মাথা রেখে শুয়ে যেও না। বরং এর অর্থ পরবর্তী বাক্য থেকে পরিস্কার হয়ে যায়। অর্থাৎ কুরআনের প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়ো না। এরূপ অবস্থা যেন না হয় যে, নিজের কাছে কুরআন মওজুদ রয়েছে। কিন্তু নিজেই অলসতায় ডুবে রয়েছে এবং কখনো দৃষ্টি উত্তোলন করে এর প্রতি তাকায় না এবং এ থেকে পথ নির্দেশ ল্যাব করার চেষ্টাও করে না। অতঃপর বলা হয়েছে- ‘এই দুনিয়ায়ই কুরআনের সওয়াব দ্রুত লাভ করার চেষ্টা করোনা। যদিও এর সওয়াব নিশ্চিতই রয়েছে এবং অবশ্যই তা পাওয়া যাবে।’ অর্থাৎ এই দুনিয়ায় এর সওয়াব তুমি না-ও পেতে পারো বরং এর উল্টো কোথাও তুমি এর কারনে শত্রুর কঠোরতার শিকার হয়ে যেতে পারো। কিন্তু এর সওয়াব অবশ্যই রয়েছে—যা অবশ্যই আখেরাতে পাওয়া যাবে। পার্থিব জীবনেও কখনো না কখনো এর সওয়াব মিলে যেতে পারে। কিন্তু তোমরা তা পার্থিব সওয়াব লাভের জন্য পড়ো না বরং আখেরাতের সওয়াব লাভের জন্য পাঠ করো।
প্রাথমিক পর্যায়ে আঞ্চলিক উচ্চারনে কুরআন পাঠের অনুমতি ছিল
৬৭। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব ( রাঃ ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি হিশাম ইবনে হাকীম ইবনে হিযামকে ( রাঃ ) সূরা ফুরকান পাঠ করতে শুনলাম। কিন্তু আমার পাঠের সাথে তাঁর পাঠের গড়মিল লক্ষ্য করলাম। অথচ স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে এ সূরাটি শিখিয়েছেন। অতএব, আমি তাঁর উপরে ঝাপিয়ে পড়তে উদ্ধত হলাম। কিন্তু ( ধৈর্য ধারন করলাম এবং ) তাঁকে অবকাশ দিলাম। সে তাঁর কিরআত শেষ করলো। অতঃপর আমি তাঁর চাদর ধরে টানতে টানতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে গেলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি তাঁকে সূরা ফুরকান পাঠ করতে শুনলাম। আপনি এ সূরাটি আমাকে যেভাবে শিখিয়েছেন সে তা অন্যভাবে পাঠ করেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- তাঁকে ছেড়ে দাও। অতপর তিনি হিশামকে বললেন- পড়। সুতরাং আমি তাঁকে যেভাবে পাঠ করতে শুনেছিলাম ঠিক সেভাবেই সে তা পাঠ করলো। অতপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এরূপই নাযিল হয়েছে। অতপর তিনি আমাকে বললেন- কুরআন সাত হরফে নাযিল করা হয়েছে। অতএব যেভাবে পাঠ করা সহজ সেভাবেই তা পাঠ করো। —– (বুখারী ও মুসলিম )
‘সাত হরফে’ অর্থ- সাত ধরনের উচ্চারন ভঙ্গি অথবা সাত ধরনের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য। আরবী ভাষায় আঞ্চলিক শব্দের পার্থক্য একটি প্রসিদ্ধ বিষয়। আরবের বিভিন্ন গোত্র ও এলাকার ভাষার মধ্যে বিশেষ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এই পার্থক্যের ধরন এমন নয় যে, তাতে ভাষার মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এই পার্থক্যের ধরন এমন নয় যে, তাতে ভাষার মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য সূচীত হয়। স্থানীয় বাক্যরীতি, উচ্চারন-ভঙ্গি, ভাষাগত বৈশিষ্ট্য এবং ভাষাগত অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য বিদ্যমান থাকা সত্যেও ভাষার মৌলিক ধাঁচ এক ও অভিন্ন। ভাষার স্থানীয় ঢং এবং পার্থক্যের দৃষ্টান্ত আপনারা এখানেও পেয়ে থাকবেন। সুতরাং আপনি যদি পাঞ্জাবের বিভিন্ন এলাকায় যান তাহলে দেখতে পাবেন এর প্রতিটি জেলা বরং একই জেলার বিভিন্ন অংশে ভাষার বিভিন্নতা রয়েছে। উর্দু ভাষারও একই অবস্থা। পেশোয়ার থেকে মাদ্রাজ পর্যন্ত চলে যান, মাদ্রাজ থেকে তাঁর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত চলে যান। উর্দুভাষীগণ একই বিষয় প্রকাশ করার জন্য বিভিন্ন বাক্যরীতি, উচ্চারন ভঙ্গি, প্রবাদ বাক্য ইত্যাদি ব্যবহার করে। দিল্লি, হাদ্রাবাদ, দাক্ষিণাত্য এবং পাঞ্জাবে একই উর্দু ভাষার বিশেষ পার্থক্য বিদ্যমান। বাংলা ভাষার অবস্থাও তদ্রূপ। একই বিষয়বস্তু প্রকাশ করার জন্য কলিকাতা, গোহাটি এবং ঢাকার বাক্যরীতি ও উচ্চারন ভঙ্গির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
আরবের আঞ্চলিক ভাষায়ও অনুরূপ পার্থক্য বিদ্যমান ছিল এবং বর্তমানেও আছে। আরবের উপদ্বীপে আপনি ইয়েমেন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত অথবা ইয়েমেন থেকে ইরাক পর্যন্ত ভ্রমন করেন। তাঁদের উচ্চারন ভঙ্গি এবং বাক্যরীতির মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করে থাকবেন। এই বিষয়বস্তু আরবের এক এলাকার এক পদ্ধতিতে প্রকাশ করা হয়, আবার অন্য এলাকায় ভিন্নরূপে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এই পার্থক্যের কারনে অর্থের কোন পরিবর্তন ঘটে না। সুতরাং এই হাদীসে সাত হরফ বলতে এই উচ্চারন ভঙ্গি, বর্ণনা ভঙ্গি ইত্যাদির পার্থক্য বুঝানো হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কুরআন শরীফ যদিও বা কুরাইশদের মধ্যে প্রচলিত বাক্যরীতিতে নাযিল হয়েছে, কিন্তু আরববাসীদের স্থানীয় উচ্চারন ভঙ্গি এবং বাক্যরীতিতে তা পাঠ করার অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। একজন আরবী ভাষী লোক যখন কুরআন পাঠ করে তখন ভাষার স্থানীয় পার্থক্য বর্তমান থাকা সত্যেও অর্থ ও বিষয়বস্তুর মধ্যে এমন কোন পরিবর্তন সূচীত হয় না। হারাম জিনিস হালাল হয়ে যাওয়া অথবা হালাল জিনিস হারাম হয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তৌহিদের বিষয়বস্তু শেরেকী বিষয়বস্তুতে পরিনত হতে পারে না ।
কুরআন যতক্ষন আরবের বাইরে ছড়ায় নি এবং আরবরাই এর পাঠক ছিল এই অনুমতি কেবল সেই যুগ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে এই অনুমতি ও সুবিধা রহিত করে দেয়া হয়। বিভিন্ন উচ্চারন ভঙ্গিতে কুরআন পাঠ করার অনুমতি কেন দেয়া হল তাও বুঝে নেয়া দরকার। এর কারন ছিল এই যে, তৎকালীন সময়ে লিখিত আকারে কুরআনের প্রচার হচ্ছিলো না। আরবের লোকেরা লেখাপড়াই জানতো না। অবস্থা এরূপ ছিল যে, কুরআন নাযিল হওয়ার সময় হাতে গনা মাত্র কয়েকজন লেখাপড়া জানা লোক ছিল। আরবে লেখাপড়ার যা কিছু রেওয়াজ ছিল তা ইসলামের আগমনের পরেই হয়েছে। সুতরাং এযুগের লোকেরা মুখে মুখে কুরআন শুনে তা মুখস্ত করে নিতো। যেহেতু তাঁদের মাতৃভাষা ছিল আরবী, এজন্য কুরআন মুখস্ত করতে এবং মুখস্ত রাখতে তাঁদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। একজন আরব যখন কুরআন শুনত তখন পুরা বিসয়বস্তুই তাঁর মুখস্ত হয়ে যেত। এরপর সে যখন অন্যদের কাছে তা বর্ণনা করতো তখন ভাষার স্থানীয় পার্থক্যের কারনে তাঁর বর্ণনার মধ্যে অনুরূপ ধরনের উচ্চারনগত পরিবর্তন হয়ে যেত। এতে মূল বিষয়বস্তুর মধ্যে কোন পার্থক্য সূচীত হতো না। স্থানীয় বাক্যরীতি অনুযায়ী তারা যেভাবে পাঠ করতো বিষয়বস্তু সেভাবে বর্ণিত হতো। এর ভিত্তিতে সেই যুগে আরবদের জন্য নিজ নিজ এলাকার উচ্চারন ভঙ্গি এবং বাক্যরীতি অনুযায়ী কুরআন পাঠ করার সুযোগ রাখা হয়েছিলো।
হযরত উমর ( রাঃ ) যেহেতু মনে করেছিলেন, তিনি যেভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কুরআন শুনেছেন–ঠিক সেভাবেই প্রত্যেকের তা পাঠ করা উচিৎ। এজন্য তিনি যখন হিশাম ( রাঃ ) কে ভিন্ন পদ্ধতিতে কুরআন পাঠ করতে শুনলেন তখন আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না। তিনি যতো সময় ধরে পাঠ করতে থাকলেন, উমর ( রাঃ ) নিজ স্থানে ততক্ষন অস্থির অবস্থায় কাটাতে থাকেন। এদিকে তিনি কুরআন পাঠ শেষ করলেন, ওদিকে উমর তাঁর চাদর টেনে ধরলেন এবং তাঁকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এনে উপস্থিত করলেন। এখন দেখুন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেজাজে কি ধরনের ধৈর্য, বিনয়, সহনশীলতা ও গাম্ভীর্য ছিল। তিনি একান্তই প্রশান্ত মনে তাঁর কথা শুনলেন। তারপর অত্যন্ত বিচক্ষনতার সাথে বুঝালেন যে, তোমরা উভয়ে যেভাবে কুরআন পাঠ করো তা সঠিক এবং নির্ভুল। আল্লাহ তায়ালা দুই ভাবেই তা পাঠ করার অনুমতি দিয়েছেন।
দীনী ব্যাপারে মতবিরোধের সীমা এবং সৌজন্যবোধ
৬৮। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ( রাঃ ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে কুরআন পাঠ করতে শুনলাম। এর পূর্বে আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভিন্নভাবে কুরআন পড়তে শুনেছি। আমি তাঁকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে আসলাম এবং তাঁকে জানালাম ( এই ব্যক্তি ভিন্ন পন্থায় কুরআন পাঠ করছে )। আমি অনুভব করলাম, কথাটা তাঁর মনপুত হল না। তিনি বললেন- তোমরা উভয়ে ঠিকভাবে পাঠ করেছো। পরস্পর মতবিরোধ করো না। কেননা তোমাদের পূর্বে যেসব জাতি ধংস হয়েছে। তারা এই মতবিরোধের কারনেই ধংস হয়েছে। —– ( সহীহ বুখারী )
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে মাসউদকে বুঝালেন যে, মতবিরোধ যদি এমন পর্যায়ের হয় যে, তাতে শিক্ষা বা হুকুম পরিবর্তিত হয় না—তাহলে এধরনের মতবিরোধ সহ্য করতে হবে। যদি তা না করে তাহলে আপশে মাথা ফাটাফাটিতে লিপ্ত হয়ে পড়বে। এভাবে উম্মতের মাঝে বিচ্ছিন্নতা এবং বিপর্যয়ের দরজা খুলে যাবে। কিন্তু যেখানে দীনের মূলনীতি অথবা দীনের কোন হুকুম পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে—সেখানে মতবিরোধ না করাই বরং অপরাধ। কেননা এরূপ ক্ষেত্রে মতবিরোধ না করার অর্থ হচ্ছে— দীনের মধ্যে তাহরিফকে ( বিকৃতি ) কবুল করে নেয়া। এটা আরেক ধরনের বিপর্যয় যার দরজা বন্ধ করে দেয়া স্বয়ং দীনের খাতিরেই প্রয়োজন।
অবিচল ঈমানের অধিকারী সাহাবী
৬৯। হযরত উবাই ইবনে কা’ব ( রাঃ ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ( একদিন ) আমি মসজিদে নববীতে ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে নামায পড়তে লাগলো। সে নামাযের মধ্যে এমনভাবে কিরআত পাঠ করলো যে, আমার কাছে আশ্চর্যজনক মনে হল। অতপর আরো এক ব্যক্তি আসলো। সে এমনভাবে কিরআত পাঠ করলো যে, প্রথম ব্যক্তির কিরআত থেকে তা ভিন্নতর ছিল। আমরা নামায শেষ করে সবাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলাম। আমি বললাম, এই ব্যক্তি এমনভাবে কিরআত পড়েছে যা আমার কাযহে সঠিক মনে হয়নি। আর এই দ্বিতীয় ব্যক্তিও ভিন্ন ধরনের কিরআত পাঠ করেছে ( এটা কেমন ব্যাপার )? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের উভয়কে ( নিজ নিজ পন্থায় ) কুরআন পাঠ করার নির্দেশ দিলেন। অতএব তারা কুরআন পাঠ করলো। তিনি উভয়ের পাঠকে সঠিক বললেন। এতে আমার অন্তরে মিথ্যার এমন কুমন্ত্রনার উদ্রেক হল যা জাহেলী যুগেও কখনো আমার মনে জাগেনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আমার এ অবস্থা লক্ষ্য করলেন, তিনি আমার বুকে সজোরে হাত মারলেন, ( মিয়া, চেতন হও, কি চিন্তা করছ? )। তিনি হাত মারতেই আমি যেন ঘামে ভেসে গেলাম, আমার বুক যেন চৌচির হয়ে গেলো এবং ভয়ের চোটে আমার মনে হল যেন আমি স্বয়ং আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছি। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন- হে উবাই, আমার কাছে যখন কুরআন পাঠানো হয় তখন আমাকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, আমি যেন তা এক হরফে ( একই উচ্চারন ভঙ্গিতে ) পাঠ করি ( এবং সেটি ছিল কুরাইশদের উচ্চারন ভংগি )। আমি প্রতি উত্তরে বললাম, আমার উম্মতের সাথে নমনীয় ব্যবহার করা হোক। অতপর আআমকে দ্বিতীয়বার বলা হল, দুই হরফে কুরআন পাঠ করতে পারো। আমি প্রতি উত্তরে আরজ করলাম, আমার উম্মতের সাথে নরম ব্যবহার করা হোক। তৃতীয় বারের জবাবে বলা হল, আচ্ছা কুরআনকে সাত রকমের ( আঞ্চলিক ) উচ্চারন ভঙ্গিতে পাঠ করতে পারো। আরো বলা হল, তুমি যতবার আবেদন করেছো ততবারই জবাব দেয়া হয়েছে। এছাড়াও তোমাকে তিনটি দোয়া করারও অধিকার দেয়া হল, তুমি তা এখন করতে পারো ( এবং তা কবুল করা হবে ) এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি আরজ করলাম, “হে আল্লাহ, আমার উম্মতকে মাফ করে দিন, হে আল্লাহ, আমার উম্মতকে মাফ করে দিন ”। আর তৃতীয় দোয়াটি আমি সেদিনের জন্য রেখে দিয়েছি যেদিন সমস্ত সৃষ্টিকুল আমার শাফায়াত লাভের আশায় চেয়ে থাকবে—এমনকি ইবরাহীমও ( আঃ )। ———- ( সহীহ মুসলিম )
হযরত উবাই ইবনে কা’ব ( রাঃ ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেহায়েত উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবী ছিলেন। তিনি প্রবীন এবং প্রাজ্ঞ সাহাবাদের মধ্যে গণ্য ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবাদের প্রত্যেকের সম্পর্কে জানতেন যে, কার মধ্যে কি যোগ্যতা এবং কামালিয়াত রয়েছে। হযরত উবাই ইবনে কা’বের কামালিয়াত ছিল এই যে, তাঁকে কুরআনের জ্ঞানে পারদর্শী মনে করা হতো। এই উবাই ইবনে কা’বের সামনেই এমন ঘতাওনা ঘটলো যে, দুই ব্যক্তি ভিন্ন দুই পন্থায় কুরআন পাঠ করলো যা তাঁর জানামতে সঠিক ছিল না। তিনি তাঁদের উভয়কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাযির করলেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের উভয়ের পাঠকেই সঠিক বলে স্বীকৃতি দিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর অন্তরে এক কঠিন এবং মারাত্মক অসওয়াসার ( বিভ্রান্তি ) উদ্রেক হয়। তা এতই মারাত্মক ছিল যে, তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, জাহেলী যুগেও এতো জঘন্য বিভ্রান্তি আমার মনের মধ্যে সৃষ্টি হয়নি যা এসময় আমার মধ্যে উদয় হয়েছিলো। তাঁর মনে যে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছিলো তা হচ্ছে- এই কুরআন কি খোদার তরফ থেক এসেছে না কোন মানুষের রচিত জিনিস—যা পাঠ করার ব্যাপারে এ ধরনের অবাধ স্বাধীনতা দেয়া হচ্ছে।
অনুমান করুন, এই হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী এ ধরনের একজন সুউচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবীর মনে এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। এ থেকে জানা গেল যে, সাহাবায়ে কেরামগনও মূলত মানুষই ছিলেন, ফেরেশতা ছিলেন না এবং মানবীয় গুনাবলী থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র ও মুক্ত ছিলেন না। তাঁদের কামালিয়াত ছিল এই যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্যে থেকে কোন মানুষ যতটা উত্তম ফায়দা উঠাতে পারে তা তারা উঠিয়েছেন। তাঁর প্রশিক্ষনের আওতায় সাহাবাদের এমন একটি দল তৈরি হয়ছিল যে, মানব জাতির ইতিহাসে কখনো এ ধরনের মানুষ দেখা যায় নি। কিন্তু তা সত্যেও তারা তো মানুষই ছিলেন। এজন্য যখন এমন একটি ব্যাপার সামনে আসলো যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া আল্লাম ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় দুই ব্যক্তির কুরআন পাঠ শুনছেন আবার দুটোকেই সহীহ বলে স্বীকৃতি দিচ্ছেন, তখন হঠাৎ করে ঐ সাহাবীর মনে এমন খেয়াল আসলো যার উল্লেখ আলোচ্য হাদীসে রয়েছে।
এখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি দেখুন। মুখমন্দলের অবস্থা দেখেই তিনি বুঝতে পারলেন, তাঁর মনে কি সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সাথে সাথে তিনি তাঁকে সাবধান এবং সতর্ক করার জন্য তাঁর বুকে হাত মারলেন, মিয়া, সচেতন হও। কি চিন্তায় মগ্ন হয়েছ?
একথাও বুঝে নেয়া দরকার যে, মনের মধ্যে অসওয়াসা সৃষ্টি হলেই মানুষ কাফের হয়ে যায় না এবং গুনাহগারও হয় না। অসওয়াসা এমন এক মারাত্মক জিনিস যে, আল্লাহ তায়ালা যদি তা থেকে বাঁচিয়ে রাখেন তাহলে বাঁচার উপায় আছে, অন্নথায় কোন মানুষই তা থেকে বেঁচে থাকতে পারে না। হাদীস সমূহের বর্ণনায় এসেছে, সাহাবাগন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাযির হয়ে আরজ করতেন, হে আল্লাহর রাসুল, কখনো কখনো আমাদের মনের মধ্যে এমন সংশয় সৃষ্টি হয় যে, তাতে আমাদের মনে হয় আমাদের পরিনতি খারাপ হয়ে গেছে। আমাদের আখেরাত নষ্ট হয়ে গেছে। একথার পরিপ্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আসল ব্যাপার তা নয় যে, তোমাদের মনে অসওয়াসা আসবে না। বরং আসল ব্যাপার হচ্ছে তা এসে তোমাদের মনে যেন স্থায়ী হতে না পারে। কোন খারাপ ধারনা মনের মধ্যে সৃষ্টি হয়ে তা শেষে হয়ে গেলে আল্লাহ তায়ালার দরবারে এজন্য পাকড়াও করা হবে না। কিন্তু যদি নিকৃষ্ট খেয়াল আসার পর তোমরা এটাকে নিজেদের মনে স্থান দাও এবং এর পোষকতা করতে থাকো, তাহলে এটা এমন জিনিস যা মানুষকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে থাকে।
হযরত উবাই ইবনে কা’বের মনের মধ্যে একটি ঘৃণ্য এবং বিপর্যয়কর অসওয়াসা সৃষ্টি হল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথে সাথেই অনুভব করলেন যে, তাঁর মনে এই অসওয়াসা এসেছে। এজন্যে তিনি তাঁর বুকে চপেটাঘাত করলেন। তিনি চপেটাঘাত করতেই উবাই ( রাঃ ) সংবিত ফিরে পেলেন এবং সাথে সাথে তিনি অনুভব করতে পারলেন যে, আমার মনে কতো নিকৃষ্ট অসওয়াসা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেছেন, এটা অনুভব করতেই আমার মনের মধ্যে এমন কম্পন সৃষ্টি হল, মনে হল আল্লাহ তায়ালা আমার সামনে উপস্থিত এবং ভয়ের চোটে আমার ঘাম ছুটে গেলো।
তাঁর এই দ্রুত প্রতিক্রিয়া মূলত তাঁর অবিচল ঈমান এবং পূর্ণতার আলামত বহন করে। তাঁর ঈমান যদি এই পর্যায়ের শক্তিশালী না হতো তাহলে তাঁর মধ্যে এরূপ কঠিন অবস্থার সৃষ্টি হতো না।
কোন ব্যক্তির ঈমান যদি মজবুত হয় এবং তাঁর অন্তরে কোন খারাপ অসওয়াসা আসে তাহলে সে কেপে যাবে এবং সে দ্রুত নিজের ভ্রান্তি বুঝতে পারবে। কিন্তু কোন ব্যক্তির ঈমানে যদি বক্রতা থেকে থাকে তাহলে তাঁর অন্তরে খারাপ অসওয়াসা আসবে এবং তা তাঁর ঈমানকে কিছুটা ধাক্কা দিয়ে চলে যাবে। অতপর সে নিজের ঈমানের দুর্বলতার কারনে এ ব্যাপারে বেপরোয়া হয়ে যাবে। অতপর সেই কুমন্ত্রনা আবারো তাঁর মনে জাগ্রত হবে এবং তাঁর ঈমানকে আর একটা নাড়া দিয়ে চলে যাবে। এমনকি একসময় তাঁর পুরা ঈমানকেই নড়বড় করে দিয়ে চলে যাবে। কিন্তু মজবুত এবং সবল ঈমানের অধিকারী ব্যক্তির অবস্থা এরূপ হয় না। সে কুমন্ত্রনা জাগ্রত হওয়ার সাথে সাথে সতর্ক হয়ে যায়। হযরত উবাই ইবনে কা’বের ( রাঃ ) প্রতিক্রিয়া সেকথারই সাক্ষ্য বহন করে। হযরত উবাই ইবনে কা’বের ( রাঃ ) সতর্ক হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বুঝানোর পর পরিস্কার করে বললেন, প্রথমে কুরআন মাজীদ যখন নাযিল হয় তখন তা কুরাইশদের মধ্যে প্রচলিত বাক্যরীতি ও উচ্চারন ভংগি অনুযায়ী নাযিল হয়। এটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরও মাতৃভাষা ছিল। কিন্তু তিনি নিজে আল্লাহ তায়ালার দরবারে আবেদন করলেন যেন তা অনুরূপ উচ্চারন ভংগিতেও পাঠ করার অনুমতি দেয়া হয়। আবেদনের ভাষা ছিল নিম্নরুপঃ “হাব্বেন আলা উম্মাতি—– আমার উম্মাতের সাথে নম্র ব্যবহার করুন।” তাঁর অনুভূতি ছিল, আমার মাতৃভাষা সাড়া আরবে প্রচলিত ভাষা নয়, বরং বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী গোত্র সমূহের মধ্যে কিছুটা স্থানীয় বাক্যরীতিরও উচ্চারন প্রচলিত রয়েছে। এজন্য সব লোকের জন্য যদি কেবল কুরাইশদের মধ্যে প্রচলিত ভাষার রীতি অনুযায়ী কুরআন পাঠ করা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয় তাহলে তারা কঠিন পরিক্ষায় নিমজ্জিত হবে। তাই তিনি আল্লাহ তায়ালার দরবারে আরজ করলেন, আমার উম্মতের প্রতি নম্রতা প্রদর্শন করা হোক। সুতরাং প্রথম আবেদনের জবাবে দুই রকম বাক্যরীতি ও উচ্চারন ভঙ্গিতে কুরআন পাঠ করার অনুমতি দেয়া হল।
নিজ বান্দার সাথে আল্লাহ তায়ালার ব্যবহারও আশ্চর্যজনক। প্রথম দফা দরখাস্তের জবাবে সাত রকম পন্থায় কুরআন পাঠ করার অনুমতি দেয়া হয় নি। অথচ সাত রকম পন্থায় পাঠ করতে দেয়ার ইচ্ছাই ছিল। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দফা আবেদন করার অপেক্ষা করলেন। এভাবে একদিকে মনে হয়, রাসুলুল্লাহকে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্য ছিল যে, নবী হিসাবে তাঁর মধ্যে নিজের দায়িত্ব পালনের কতটা অনুভূতি রয়েছে। এজন্য প্রথমে একক ভংগিতেই কুরআন নাযিল করা হয়। কিন্তু যেহেতু তাঁর মনে এই অনুভূতি জাগ্রত ছিল যে, আরবের লোকদের হেদায়াত করাই আমার সর্ব প্রথম দায়িত্ব। আর আরবদের ভাষায় স্থানীয় পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। যদি কুরআন মাজীদের একটি মাত্র অঞ্চলের বাক্যরীতি অনুযায়ী পাঠ করার অনুমতি দেয়া হয় তাহলে লোকেরা কঠিন বিপদে পড়ে যাবে। তাই তিনি আল্লাহ তায়ালার দরবারে আরজ করলেন, আমার উম্মতের সাথে নরম ব্যবহার করা হোক। জবাবে দুই আঞ্চলিক রীতিতে তা পাঠ করার অনুমতি দেয়া হল। তিনি পুনরায় আরজ করলেন, আমার উম্মতের সাথে আরো নম্র ব্যবহার করা হোক। এভাবে তাঁর দুই দফা আবেদন করার পর সাত রীতিতে কুরআন পাঠ করার অনুমতি দেয়া হল। এরপর আল্লাহ তায়ালা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, যেহেতু তুমি আমার কাছে তিনবার দরখাস্ত করেছো এবং আমি তিনবারই জবাব দিয়েছি—এজন্য এখন তোমাকে আমার কাছে অতিরিক্ত তিনটি দোয়া করার অনুমতি সেয়া হল। পরম দয়ালু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দান করার এই ধরন আপনি লক্ষ্য করুন। এ জিনিসটিকেই তিনি কুরআন মাজীদে বলেছেন-
“রহমাতী অয়াসিয়াত কুল্লা শাইয়েন—— আমার অনুগ্রহ প্রতিটি সৃষ্টির উপর প্রসারিত হয়ে আছে।” ( সূরা আরাফ ; ১৫৬ )
এই হচ্ছে রহমতের ধরন যে, তুমি যেহেতু তোমার উম্মতের সাথে নম্র ব্যবহার করার জন্যে আমার কছে তিনবার আবেদন করেছে—তাই তোমার দায়িত্ব পালনের এ পদ্ধতি আমার পছন্দ হয়েছে। এজন্য তোমাকে এখন আরো তিনটি আবেদন করার অধিকার দেয়া হল। আমি তা অবশ্যই কবুল করবো।
এখন দেখুন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুইবার দোয়া করে তৃতীয় বারের দোয়াটি আখেরাতের জন্য হাতে রেখে দিয়েছেন। অন্য দুটি দোয়াও তিনি কোন পার্থিব স্বার্থ, ধন-দৌলত এবং ক্ষমতা ও কৃতিত্ব হাসিল করার জন্য করেন নি। বরং তিনি দোয়া করলেন, আমার উম্মতের সাথে ক্ষমা সুন্দর ব্যবহার করা হোক। তিনি বলেছেন- “ইগফিরলি উম্মাতি—— আমার উম্মাতকে ক্ষমা করুন।” আরবী ‘মাগফিরাত’ শব্দের আসল অর্থ হচ্ছে ক্ষমা করা, অপরাধ উপেক্ষা করা, অপরাধ দেখেও না দেখা ইত্যাদি। ‘মিগফার’ বলা হয় এমন শিরস্ত্রানকে যা মাথাকে ঢেকে রাখে, গোপন করে রাখে। সুতরাং ‘ইগফিরলি উম্মাতি’- বাক্যাংশের অর্থ হচ্ছে- আমার উম্মাতের সাথে ক্ষমা, নম্রতা ও উদারতা পূর্ণ ব্যবহার করা হোক।
এরকম ব্যবহার তো হচ্ছে এই যে, কোন ব্যক্তি অপরাধ করলো এবং দ্রুত তাঁকে শাস্তি দেয়া হল। আরেক রকম ব্যবহার হচ্ছে এই যে, আপনি অপরাধ করেছেন আর আপনার অপরাধকে উপেক্ষা করা হচ্ছে এবং আপনাকে সতর্ক হওয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। আপনি পুনরায় অপরাধ করছেন এবং আপনাকে সংযত হওয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এভাবে পুনঃ পুনঃ আপনার অপরাধ উপেক্ষা করে আপনাকে সংশোধনের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। আপনি যেন শেষ পর্যন্ত সংশোধন হতে পারেন এবং নিজেকে সংযত করতে পারেন।
ঘটনা হচ্ছে, মুসলমান যে জাতির নাম—তাঁদের কাছে আল্লাহ তায়ালার সর্বশেষ কালাম কুরআন মাজীদ অবিকল মওজুদ রয়েছে। এর মধ্যে আজ পর্যন্ত কোন প্রকার রদবদল হতে পারেনি। আবার মুসলমানরাই সেই জাতি যাদের কাছে মহানবী ( সাঃ ) এর সীরাত, তাঁর বানী এবং তাঁর পথনির্দেশ অবিকল ও অপরিবর্তিত অবস্থায় সম্পূর্ণ সংরক্ষিত আছে। তাঁদের খুব জানা আছে হক কি এবং বাতিল কাকে বলে। তারা এও জানে যে, আমাদের কাছে আমাদের প্রতিপালকের দাবী কি। আমাদের প্রিয় নবী ( সাঃ ) কোন পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। এ ধরনের একটি জাতি যদি ব্যক্তিগতভাবে অথবা সামস্টিগতভাবে নাফরমানী বা অসাদাচরন করে বসে কিন্তু তা সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালা তাঁদের ডলে- পিষে শেষ করে না দেন— তাহলে এটা তাঁর সীমাহীন রহমত, বিরাট ক্ষমা এবং অনুগ্রহ ছাড়া আর কি? এক ধরনের অপরাধ তো হচ্ছে- অপরাধী জানতেই পারেনা যে, সে অপরাধ করেছে এবং সে আবারো অপরাধ করে বসলো। এ অবস্থায় সে এক ধরনের নম্র ব্যবহার পাওয়ার উপযোগী। কিন্তু এক ব্যক্তির জানা আছে আইন কি? এই আইনের দৃষ্টিতে কোন জিনিসটি অপরাধ তা তাঁর জানা আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে আইন ভঙ্গ করে। এর অর্থ হচ্ছে- এই ব্যক্তি কঠোর শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত। বর্তমান কালের মুসলমানদের দৃষ্টান্ত হল এটাই। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেখুন আজ তের- চৌদ্দশত বছরে আল্লাহ তায়ালার ব্যাপক শাস্তি আজ পর্যন্ত মুসলমানদের উপর নাযিল হয়নি। যদিও কোন কোন স্থানে পরীক্ষামুলক ভাবে বিপর্যয় এসেছে তবে অন্য স্থান সামলিয়ে নিয়েছে। এতো সেই দোয়ারই ফল যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তায়ালার দরবারে আবেদন করেছিলেন- আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন, তাঁদের অপরাধ উপেক্ষা করুন, তাঁদের সাথে কঠোরতা না করুন। সুতরাং তাঁর সেই দোয়া বাস্তবিকই কবুল হয়েছে।
এখানে একথাও ভালো করে বুঝে নেয়া দরকার যে, ‘ইগফির লি উম্মাতি’ বাক্যের দ্বারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কখনো উদ্দেশ্য এই ছিল না যে, আমার উম্মত যে কোন ধরনের খারাপ কাজই করুক না কেন তা সবই ক্ষমা করে দেয়া হবে। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তির নিজের কাধে বকরী বহন করে নিয়ে আসবে তা ভ্যা ভ্যা করতে থাকবে। সে আমাকে দাকবে – ইয়া রাসুলুল্লাহ, ইয়া রাসুলুল্লাহ।। — আমি তাঁকে কি জবাব দেব? আমি বলব- এখন আমি তোমার কোন উপকারে আসবো না। কারন পূর্বেই আমি তোমার কাছে খোদার বিধান পৌছে দিয়েছি।” অর্থাৎ তোমরা যদি এমন অপরাধ করে আসো যার শাস্তি অবশ্যই পাওয়া উচিৎ— তাহলে তোমরা আমার শাফায়াত লাভের অধিকারী হতে পারবে না। কিয়ামতের দিনের শাফায়াতের অর্থ এই নয় যে, সে যেহেতু আমার লোক, সুতরাং দুনিয়াতে জুলুম- অত্যাচার করেই আসুক না কেন জনগনের অধিকার আত্মসাৎ করেই আসুক না কেন কিন্তু তাঁকে ক্ষমা করিয়ে দেয়া হবে। আর অন্যরা জুলুম করলে তাঁদের গ্রেফতার করা হবে। কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফায়াতের অর্থ কখনো এটা নয়।
পঠন ভঙ্গির পার্থক্যের কারনে অর্থের কোন পার্থক্য হয় না
৭০। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ( রাঃ ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- জিব্রাঈল ( আঃ ) প্রথমে আমাকে এক রীতিতে কুরআন পড়িয়েছেন। অতপর আমি তাঁর কাছে বার বার দাবী তুললাম যে, কুরআন মাজীদ ভিন্ন রীতিতেও পাঠ করার অনুমতি দেয়া হোক। তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন এবং তা সংখ্যায় সাতরীতি পর্যন্ত পৌছাল। অধঃস্তন রাবী ইবনে শুহাব যুহরী বলেন, যে সাত হরফে ( রীতি ) কুরআন পাঠ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে—তা সংখ্যায় সাত হওয়া সত্ত্বেও যেন একটি রীতিরই বিকল্প ব্যবস্থা ছিল। এই একাধিক রীতিতে কুরআন পাঠ করলে ( কথা একই থাকে) হালাল– হারামের মধ্যে পরিবর্তন সূচীত হয় না। ——- ( সহীহ বুখারী ও মুসলিম )
সাত রীতিতে কুরআন পড়ার ব্যাখ্যা ইতিপূর্বেই করা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিরলস প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে যখন ইসলামী সমাজ এবং রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে উঠলো, তখন এই সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব সমূহের মধ্যে একটি ছিল জনগণকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। কেননা মুসলমান এবং জাহেলিয়াত দুটি জিনিসের একই দর্পণ হতে পারে না। প্রাথমিক অবস্থায় ইসলামী রাষ্ট্র জনগণকে মৌখিক পদ্ধতিতে দীনের শিক্ষা দান করেছে। কিন্তু এর সাথে সাথে গোটা জাতিকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত ছিল। সুতরাং খেলাফতে রাশেদার যুগে এতো ব্যাপক আকারে শিক্ষা সম্প্রসারনের কাজ চলে যে, একটি তথ্যের ভিত্তিতে সে সময় শতকরা একশো জন লোকই অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিলো। লোকেরা যেন কুরআন পড়তে সক্ষম হয়ে যায় এই লক্ষ্য সামনে থাকায় এরূপ ফল সম্ভব হয়েছিলো। অর্থাৎ মুসলমানদের দৃষ্টিতে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন হওয়ার সর্বপ্রথম গুরুত্ব এই ছিল না যে, লোকেরা যেন দুনিয়াবী ব্যাপারসমূহ লিখন ও পঠনে পারদর্শী হয়ে যাক। এতো কেবল একটা কর্মগত সুবিধা। আসল ফায়দা এই যে, লোকেরা কুরআন পড়ার যোগ্য হয়ে যায়। যখন তারা কুরআন পড়ার যোগ্য হবে না এবং সরাসরি জানতে পারবে না যে, তাঁর প্রতিপালক তাঁর উপর কি কি দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। তাঁকে কোন পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন এবং সে পরীক্ষায় তাঁর সফল হওয়ারই বা পথ কি, আর বিফল হওয়ার কারন সমূহই বা কি—ততক্ষন তারা একজন মুসলমানের মতো জীবন যাপন করার যোগ্য হতে পারবে না। এ জন্য জনগণকে শিক্ষিত করে তোলার ব্যবস্থা ইসলামী সমাজে মৌলিক গুরুত্বের দাবীদার। ইসলামী খেলাফত এই কাজকে নিজের মৌলিক কর্তব্য বিবেচনা করেই আঞ্জাম দিয়েছে। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রাথমিক যুগেই মদিনায় শিক্ষা সম্প্রসারনের কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। বদরের যুদ্ধের ঘটনায় জানা যায়, যখন কুরাইশ গোত্রের লোক বন্দী হয়ে আসলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের বললেন- তোমাদের মধ্যে যে লেখাপড়া জানে সে এখানে এতজন বালককে লেখাপড়া শেখাবে। তাহলে কোনরূপ বিনিময় ব্যতিরেকে তাঁকে মুক্ত করে দেয়া হবে। এ থেকেই অনুমান করা যায়, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লামের দৃষ্টিতে লোকদেরকে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন করে তোলা কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
জনগণকে যখন শিক্ষিত করে গড়ে তোলা সম্ভব হল এবং তারা লেখাপড়ার উপযুক্ত হয়ে গেলো, এরপর বিভিন্ন আঞ্চলিক উচ্চারনে কুরআন পড়ার অনুমতি রহিত করে দেয়া হল এবং শুধু কুরাইশদের ভাষার প্রচলন অবশিষ্ট রাখা হয়। কেননা কুরআন মাজীদ কুরাইশদের আঞ্চলিক ভাষায় নাযিল হয়েছিলো। যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরও মাতৃভাষা ছিল। তাঁর নিয়ম ছিল, যখনই কুরআন মাজীদ নাযিল হতো, তখন প্রথম অবসরেই তিনি কোন লেখাপড়া জানা সাহাবীকে ডেকে তা শিখিয়ে দিতেন। এখানে বলা প্রয়োজন যে, কুরাইশদের মধ্যে প্রচলিত বাক্যরীতি ছাড়াও প্রথম দিকে আরবের অপরাপর এলাকার বাক্যরীতি অনুযায়ী কুরআন পাঠ করার অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। পরবর্তীকালে এই অনুমতি রহিত করে দেয়া হয়। আর প্রথম থেকেই কুরআন মাজীদ কুরাইশদের মধ্যে প্রচলিত অভিধান অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করা হয়।
আঞ্চলিক ভাষায় কুরআন পড়ার অনুমতি
একটি বিরাট সুযোগ ছিল
৭১। হযরত উবাই ইবনে কা’ব ( রাঃ ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিব্রাঈল ( আঃ ) এর সাথে সাক্ষাত করলেন। তিনি বললেন- হে জিব্রাঈল, আমি একটি নিরক্ষর উম্মতের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। এদের মধ্যে রয়েছে বৃদ্ধা ও বৃদ্ধ, কিশোর- কিশোরী এবং এমন ব্যক্তি যে কখনো পড়া-লেখা করেনি। জিব্রাঈল ( আঃ ) বললেন- হে মুহাম্মদ, কুরআন সাত রীতিতে নাযিল হয়েছে। — ( তিরমিযি )
মুসনাদে আহমাদ ও আবু দাউদের বর্ণনায় আছে, জিব্রাঈল ( আঃ ) আরো বললেন- “কুরআন যেসব রীতিতে নাযিল হয়েছে তা আরোগ্য দানকারী এবং যথেষ্ট।”
নাসাঈর বর্ণনায় আছে, “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- জিব্রাঈল এবং মিকাঈল ( আঃ ) আমার কাছে আসলেন। জিব্রাঈল আমার ডান পাশে বসলেন এবং মিকাঈল আমার বাম পাশে বসলেন। অতপর জিব্রাঈল আমাকে বললেন- কুরআন মাজীদ এক রীতিতে ( অর্থাৎ কুরাইশদের মধ্যে প্রচলিত বাক্যরীতি অনুযায়ী ) পাঠ করুন। মিকাঈল আমাকে বললেন, আরো এক রীতিতে পাঠ করার অনুমতি চান। ( আমি এই অনুমতি চাইতে থাকলাম )। এমনকি শেষ পর্যন্ত সাত রীতিতে কুরআন পাঠ করার অনুমতি দেয়া হল। সুতরাং এর প্রত্যেক রীতিই আরোগ্য দানকারী এবং যথেষ্ট।”
প্রত্যেক রীতি নিরাময়কারী ও যথেষ্ট হওয়ার অর্থ হচ্ছে—এর মধ্যে কোন প্রকারের ভ্রান্তির আশংকা নেই। কুরাইশদের অভিধান অনুযায়ী কুরআন পাঠ যেভাবে আরোগ্য দানকারী এবং যথেষ্ট অনুরূপভাবে অন্যান্য গোত্রের অভিধান অনুযায়ী তাঁর পাঠ আরোগ্য দানকারী এবং যথেষ্ট। এর মধ্যে যে কোন গোত্রের অভিধান অনুযায়ী কুরআন পাঠ করলে তাতে কুরআনের মূল উদ্দেশ্য ও অর্থের পরিবর্তন ঘটার কোন আশংকা নেই।
কুরআন পড়ে শুনানোর পারিশ্রমিক নেয়া অবৈধ
৭২। হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন ( রাঃ ) থেকে বর্ণিত। একবার তিনি এক কাহিনীকারের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। সে কুরআন পড়ছিল আর ভিক্ষা চাচ্ছিল। এ দেখে তিনি ইন্না লিল্লাহি অ-ইন্না ইলাইহি রাজিউন পাঠ করলেন, অতপর বললেন- আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কুরআন পড়ে তাঁর যা চাওয়ার আছে তা যেন আল্লাহ তায়ালার কাছে চায়। কেননা অচিরেই এমন একদল লোকের আবির্ভাব হবে যারা কুরআন পাঠ করবে এবং মানুষের কাছে এর বিনিময় চাইবে। —( আহমাদ, তিরমিযি)
হাদিসটির বিষয়বস্তু পরিস্কার। তবুও এখানে একটি কথা খেয়াল রাখা দরকার। কুরআন শরীফ পড়ে তাঁর বিনিময় লওয়া কিংবা নামায পড়িয়ে তাঁর পারিশ্রমিক গ্রহন করা শরিয়তের দৃষ্টিতে যদিও নেহায়েত নিষিদ্ধ কাজ এবং প্রাচীন ফিকাহবিদগণ তা নাজায়েজ হওয়ার ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন ; কিন্তু পরবর্তীকালে এমন কিছু বিষয়ের উদ্ভব হয় যার ফলে সমসাময়িক কালের ফিকাহবিদগণ লক্ষ্য করলেন যদি এই জাতীয় কোন পারিশ্রমিক গ্রহন করা চূড়ান্তভাবেই নিষিদ্ধ রাখা হয় তাহলে মসজিদ সমুহে পাঁচ ওয়াক্তের নিয়মিত আযান ও জামায়াত সহকারে নামায আদায়ের ব্যবস্থা চালু না থাকার এবং কুরআন শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দিতে পারে এবং মসজিদের দেখাশুনা ও তা সজীব রাখার কাজ ব্যহত হতে পারে। এজন্য তারা একটি বিরাট কল্যাণের দিকে লক্ষ্য রেখে সিদ্ধান্ত নিলেন যেসব লোক নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে ইমামতি করার অথবা কুরআন শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব গ্রহন করবে তাঁদের জন্য পারিশ্রমিক নেয়া জায়েজ। তবুও নীতিগতভাবে একথা স্বস্থানে ঠিকই আছে যে, কোন আলেম যদি অন্য কোন উপায়ে নিজের সাংসারিক ব্যয়ভার বহন করার জন্য অর্থ উপার্জন করতে পারেন এবং সাথে সাথে বিনা পারিশ্রমিকে কোন নির্দিষ্ট মসজিদে নামাযের জামায়াতে নিয়মিত ইমামতি করতে সক্ষম হন তাহলে এর চেয়ে ভালো কথা আর কি হতে পারে? যে ব্যক্তি মসজিদের দরজায় বসে জুতা সেলাই করে জীবিকা অর্জন করে এবং পাঁচ ওয়াক্তের নামাযে ইমামতি করার দায়িত্ব গ্রহন করে এবং কারো কাছ থেকে একটি পারিশ্রমিক গ্রহন করেনা— আমার মরে এই ইমাম খুবই সম্মান পাওয়ার যোগ্য। এতদসত্তেও যদি কোনভাবেই তা সম্ভব না হয় এবং সে ধরনের কোন কাজেরও সংস্থান করা না যায়, তাহলে সর্বশেষ উপায় হিসেবে ইমাম সাহেব বেতন গ্রহন করবেন। মসজিদ কমিটিও ইমাম সাহেবের বেতনের ব্যবস্থা করে মসজিদকে জীবন্ত রাখার ব্যবস্থা করবেন।
কুরআনকে জীবিকা অর্জনের উপায়ে পরিনতকারী অপমানিত
৭৩। হযরত বুরাইদাহ ( রাঃ ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- যে ব্যক্তি মানুষের কাছ থেকে রুটি রুজি অর্জন করার উদ্দেশ্যে কুরআন পড়ে, সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আসবে যে, তাঁর চেহারায় কেবল হাড়গোড়ই অবশিষ্ট থাকবে এবং তাতে গোশত থাকবে না। –( বায়হাকীর শুয়াবুল ঈমান )
কোন ব্যক্তির চেহারায় গোশত না থাকার অর্থ সে অপমানিত হবে। আমরা অনেক সময় বলে থাকি অমুক ব্যক্তি বে-আব্রু হয়ে পড়েছে। শব্দটির মূল অর্থ হচ্ছে- চেহারার সৌন্দর্য। সুতরাং কারো অপমানিত হওয়ার ব্যাপারটি আমরা অনেক সময় বলে থাকি “তাঁর মুখোশ উন্মোচিত হয়ে গেছে”। অর্থাৎ তাঁর আসল চেহারা ধরা পড়ে গেছে এবং লোক সম্মুখে হেয় প্রতিপন্ন হয়েছে। অতএব, চেহারায় গোশত না থাকাটা ‘লাঞ্ছিত ও অপমানিত’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি কুরআন পড়াকে পার্থিব স্বার্থ হাসিলের উপায়ে পরিনত করবে, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাঁকে অপমানিত করবেন।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম দুই সুরাকে পৃথককারী
৭৪। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ( রাঃ ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জানা ছিল না যে, এক সূরা কথায় শেষ হয়েছে। এবং অপর সূরা কথা থেকে শুরু হয়েছে। অবশেষে তাঁর উপর ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ নাযিল হয়। —- ( আবু দাউদ )
অর্থাৎ সূরা সমূহের সূচনা এবং সমাপ্তি নির্ণয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন অসুবিধার সম্মুখীন হলেন, আল্লাহ তায়ালা তখন ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ নাযিল করে বলে দিলেন, যেখানে উল্লেখিত বাক্য শুরু হয়েছে সেখানেই একটি সূরা শেষ হয়েছে এবং অপর সূরা শুরু হয়েছে। এভাবে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ আয়াতটি মূলত সূরা সমূহের মাঝে সীমারেখা হিসাবা ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা সূরা সমূহের সূচনা ও সমাপ্তি নির্দেশ করার জন্যে এ আয়াত নাযিল করেন। এ তাসমিয়া কুরআন মাজীদের ‘সূরা নামলের’ একটি আয়াত ( ৩০ ) হিসাবেও নাযিল হয়েছে। সাবা রাজ্যের রানী তাঁর সভাসদগণকে বললেন- আমার নামে হযরত সুলাইমান ( আঃ ) এর একটি চিঠি এসেছে। তা ‘বিসমিল্লাহির রাহামানির রাহীম’ বাক্য দ্বারা শুরু হয়েছে ( ওয়া ইন্নাহু বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম ) সেখানে এটা ঐ সুরার আয়াত হিসাবে নাযিল হয়েছে। আর এখানে বলা হয়েছে- আল্লাহ তায়ালা এটাকে সূরা সমূহের মাঝে সীমারেখা হিসাবে ব্যবহার করেছেন। এখন এই তাসমিয়া দ্বারা প্রতিটি সূরা শুরু হয়। অবশ্য একটি ব্যতিক্রম আছে। তা হচ্ছে সূরা তাওবার শুরুতে বিসমিল্লাহ নেই। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের লেখান যে পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছিলো তাতে সূরা তাওবার প্রারম্ভে বিসমিল্লাহ ছিল না। এ জন্য সাহাবাগন তা অনুরূপভাবেই নকল করেছেন। তারা নিজেদের পক্ষ থেকে তাতে বিসমিল্লাহ সংযোজন করেন নি।
এ থেকে আপনারা অনুমান করতে পারেন যে, সাহাবায়ে কেরাম কুরআন মাজীদকে গ্রন্থাকারে সংকলন করার সময় কতটা দায়িত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁদের জানা ছিল যে, সূরা সমূহকে পরস্পর থেকে পৃথক করার জন্য প্রতিটি সুরার প্রারম্ভে বিসমিল্লাহ লেখা হয়েছিলো। তারা এর উপর অনুমান করে সূরা তাওবার সুচনায় তা লিখে দিতে পারতেন। অথবা এরূপ ধারনাও করতে পারতেন যে, সম্ভবত এই সুরার প্রারম্ভে বিসমিল্লাহ লেখানোর খেয়াল তাঁর নাও থাকতে পারে। অথবা যে সাহাবীকে দিয়ে তিনি অহী লেখাতেন হয়তো তিনি তা লিখতে ভুলে গিয়ে থাকবেন ; বরং এধরনের কোন ভিত্তিহীন কিয়াসের আশ্রয় না নিয়ে তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের লেখান মাসহাফ যেভাবে পেয়েছেন হুবহু সে ভাবেই নকল করেছেন। কিন্তু নিজেদের পক্ষ থেকে এর মধ্যে একটি বিন্দুও সংযোজন করেন নি।
এটা আল্লাহ তায়ালার এক মহান অনুগ্রহ যে, তিনি তাঁর কিতাবের হেফাজতের জন্য এই অতুলনীয় ব্যবস্থা করেছেন। দুনিয়ায় বর্তমানে এমন কোন আসমানি কিতাব নেই যার মধ্যে আল্লাহ তায়ালার বানী তাঁর আসল অবস্থায় এবং কোন মিশ্রন ও রদবদল ছাড়া এভাবে সংরক্ষিত আছে। এই মর্যাদা কেবল কুরআন মাজিদেরই রয়েছে।
সাহাবাগন কতটা দায়িত্ব নিয়ে কুরআন মুখস্ত করেছেন
আরবী***
৭৫। তাবেঈ হযরত আলকামা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা ( সিরিয়ার ) হেমস নগরীতে ছিলাম। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ( রাঃ ) সূরা ইউসুফ পাঠ করলেন। সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তি বললো- এটা এভাবে নাযিল হয় নি। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ( রাঃ ) বললেন, আল্লাহর শপথ, আমি এ সূরা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে পড়েছি। আমার পাঠ শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তুমি ঠিকভাবে পড়েছ”। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ( রাঃ ) লোকটির সাথে কথা বলছিলেন, এ সময় তিনি তাঁর মুখ থেকে মদের গন্ধ পেলেন। তিনি বললেন- তুমি শরাব পান করেছো আর কুরআন শুনে তা মিথ্যা সাব্যস্ত করতে চাচ্ছ? অতএব তিনি তাঁর উপর ( মদ পানের অপরাধে ) শাস্তির দণ্ড কার্যকর করেন। — ( বুখারী ও মুসলিম )
এ হাদিসটি এখানে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে- সাহাবাদের মধ্যে যারা লোকদের মাঝে কুরআন পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করেছেন—তারা হয় সরাসরি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে শুনে তা মুখস্ত করেছেন, অথবা অন্যের কাছে শুনে তা মুখস্ত করে তা আবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুনিয়েছেন। তিনি তা শোনার পর এর সমর্থন করেছেন যে, তুমি সঠিক মুখস্ত করেছো। এভাবে আমাদের কাছে কুরআন পৌঁছানোর কোন মাধ্যম এরূপ ছিলনা যে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করার অবকাশ থাকতে পারে।
কুরআন মাজীদ কিভাবে একত্রে জমা করা হয়েছিলো
৭৬। হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত ( রাঃ ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে সময় ইয়ামামার যুদ্ধে অসংখ্য সাহাবা শহীদ হলেন, হযরত আবু বকর ( রাঃ ) আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি উপস্থিত হয়ে দেখলাম হযরত উমরও ( রাঃ ) সেখানে হাযির আছেন। আবু বকর (রাঃ) আমাকে বললেন- উমর আমার কাছে এসেছে এবং সে বলছে- “ইয়ামামার যুদ্ধে কুরআনের অসংখ্য কারী ( যাদের কুরআন মুখস্ত ছিল এবং লোকদের তা পড়ে শুনাতেন ) শহীদ হয়ে গেছেন। আমার আশংকা হচ্ছে— অন্যান্য যুদ্ধেও যদি কুরআনের কারীগন শহীদ হয়ে যায়, তাহলে কুরআনের বিরাট অংশ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এজন্য আমার রায় হচ্ছে এই যে, আপনি কুরআনকে একত্রিত ( বইয়ের আকারে গ্রন্থাবদ্ধ ) করার নির্দেশ দেন।”
আবু বকর ( রাঃ ) বলেন, আমি উমরকে বললাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে কাজ করেননি তা তুমি কিভাবে করবে? উমর ( রাঃ ) বললেন, আল্লাহর শপথ এটা খুবই ভালো কাজ। সে এ ব্যাপারে আমাকে বরাবর পীড়াপীড়ি করতে থাকলো। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা– এ কাজের জন্য আমার অন্তরকে উম্মুক্ত করে দিলেন। ( অর্থাৎ আমি আশ্বস্ত হলাম যে, এটা খুবই উপকারী কাজ এবং তা একটি শরঈ প্রয়োজনকে পূর্ণ করবে।) আমার অভিমতও উমরের অভিমতের সাথে মিলে গেলো।
যায়েদ ( রাঃ ) বলেন, অতপর আবু বকর ( রাঃ ) আমাকে বললেন, “তুমি একটি যুবক বয়সের লোক এবং বুদ্ধিমান। তোমার ব্যাপারে আমাদের কোন সন্দেহ নেই ( অর্থাৎ তুমি যে কোন দিক থেকে নির্ভরযোগ্য )। তুমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অহী লেখার কাজেও নিয়োজিত ছিলে। অতএব তুমি কুরআন মাজীদের অংশগুলো খুঁজে বের করো এবং একত্রে জমা করো।” যায়েদ ( রাঃ ) বলেন, আল্লাহর শপথ, তিনি যদি আমাকে পাহাড় তুলে আনার হুকুম দিতেন তাহলে এটা আমার কাছে এতো কঠিন মনে হতোনা— যতটা কঠিন মনে হচ্ছে তাঁর এই কাজের নির্দেশ। আমি আরজ করলাম, আপনি একাজ কেমন করে করবেন যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেননি? আবু বকর ( রাঃ ) আমাকে জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ এটা বড়ই ভালো কাজ।
অতপর আবু বকর ( রাঃ ) এ কাজের জন্য আমাকে বার বার তাগাদা দিতে থাকলেন। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা এ কাজের জন্য আমার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিলেন— যার জন্য তিনি আবু বকর ( রাঃ ) এবং উমরের ( রাঃ ) অন্তরকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। অতপর আমি কুরআন মাজীদকে খেজুরের বাঁকল, সাদা পাথরের পাত এবং লোকদের বুক ( স্মৃতি ) থেকে তালাশ করে একত্রে জমা করা শুরু করে দিলাম। অবশেষে আমি সূরা তাওবার শেষ আয়াত আবু খুজাইমা আনসারীর ( রাঃ ) কাছে পেলাম। তা আর কারো কাছে পেলাম না। আয়াতটি হচ্ছে- “লাকাদ- জায়াকুম—রাসুলুম- মিন আন ফুসিকুম” শেষ পর্যন্ত। এভাবে কুরআন মাজীদের যে সহীফা একত্রিত করা হল বা লেখা হল তা হযরত আবু বকরের ( রাঃ ) জীবদ্দশা পর্যন্ত তাঁর কাছে থাকে। অতঃপর তা হযরত উমরের ( রাঃ ) কাছে তাঁর জীবনকাল পর্যন্ত থাকে। অতঃপর তা উম্মুল মু’মিনিন হযরত হাফসা ( রাঃ ) এর যিম্মায় থাকে। —- ( সহীহ বুখারী )
হযরত আবু বকরের ( রাঃ ) মনে এই সন্দেহ উদ্রেক হয় যে, কুরআন মাজীদ একত্রে জমা করা যদি কোন জরুরী কাজ হতো এবং দীনের হেফাজতের জন্য এটা করার প্রয়োজন হতো তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামই তাঁর জীবদ্দশায় কুরআন মাজীদকে একত্রিত করে পুস্তকের আকারে সংকলিত করিয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি যখন একাজ করেননি আমরা তা করার দুঃসাহস কি করে করতে পারি? কিন্তু হযরত উমরের ( রাঃ ) যুক্তি ছিল এই যে, কোন একটি কাজ যদি উত্তম বলে বিবেচিত হয় এবং শরীয়ত ও ইসলামের মৌলিক কাজের অনুকূল হয়, তাহলে এর শরঈ প্রয়োজন থাকা এবং তা স্বয়ং একটি ভালো ও কল্যাণকর কাজ হওয়া এবং এর বিপক্ষে কোন নিষেধাজ্ঞা বর্তমান না থাকাটাই সেই কাজ জায়েজ হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। এজন্যই তিনি বলেছেন, আল্লাহর শপথ, আমার দৃষ্টিতে এ কাজ উত্তম।
“খোদার শপথ, তিনি যদি আমাকে পাহাড় তুলে নিয়ে আসার নির্দেশ দিতেন তাহলে এ কাজ আমার কাছে এতটা কঠিন মনে হতো না, যতটা কঠিন মনে হচ্ছে তাঁর এই কাজের নির্দেশ”। —– হযরত যায়েদের ( রাঃ ) এই মন্তব্য তাঁর তীক্ষ্ণ অনুভূতির প্রতিনিধিত্ব বহন করে যে, কুরআন একত্রে জমা করা একটি কঠিন দায়িত্বপূর্ণ কাজ।
কুরআন মাজীদকে বিভিন্ন জায়গা থেকে একত্রিত করা, অতঃপর তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশিত ক্রমানুযায়ী লিপিবদ্ধ করা এবং তাতে কোনরূপ ভুল—ভ্রান্তি না হওয়া মূলতই এক কঠিন দায়িত্বপূর্ণ কাজ ছিল। “আমার দ্বারা যদি বিন্দু পরিমাণও ভুল হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যৎ বংশধরদের কাছে কুরআন ভ্রান্তি সহকারে পৌছার সমস্ত দায়দায়িত্ব আমাকেই বহন করতে হবে।” —হযরত যায়েদ ( রাঃ ) এর মনে এই অনুভূতি পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিল। এই অনুভূতির কারনেই তিনি বলেছেন—পাহাড় উত্তোলন করে নিয়ে আসার চেয়েও অধিক কঠিন কুরআন সংকলনের এই বোঝা আমার উপরে চাপানো হয়েছে।
এ হাদীস থেকে জানা যায়, তিনটি উৎস থেকে কুরআন মাজীদ সংগ্রহ করা হয়েছে।
একটি উৎস এই ছিল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে কুরআন মাজীদ লিখিয়েছিলেন তা খেজুর বাঁকল, সাদা পাথরের পাতলা তক্তির উপর লেখা ছিল। রাসুলুল্লাহর ( সাঃ ) নীতি ছিল— যখন অহী নাযিল হতো, তিনি লেখাপড়া জানা কোন সাহাবীকে ডেকে তিনি নির্দেশ দিতেন— এই সূরাটি অথবা এই আয়াতগুলো অমুক অমুক স্থানে লিখে দাও। এই সাহাবীদের কাতিবে অহী বা অহী লেখক বলা হতো। লেখা শেষ হলে আবার তিনি তা পড়িয়ে শুনতেন যাতে এর নির্ভুলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন। অতপর তা একটি থলের মধ্যে ঢেলে দিতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে ( সামনের হাদীসে আসছে ) এও বলে দিয়েছেন যে, অমুক আয়াত অমুক সুরার অংশ এবং অমুক আয়াতের পরে এবং অমুক আয়াতের পূর্বে সংযোজিত হবে। অনুরূপভাবে সূরা সমূহের ক্রমবিন্যাসও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করে দিয়েছেন। এতে লোকেরা জানতে পারল যে, সূরাগুলোর ক্রমবিন্যাস কিভাবে করা হয়েছে। কিন্তু তিনি কুরআন মাজীদকে একটি পুস্তকের আকারে লিখাননি—যে আকারে আজ তা আমাদের সামনে রয়েছে।
হযরত যায়েদ ( রাঃ ) বলেন, এই থলের মধ্যে পাথরের যেসব তক্তি এবং খেজুর বাঁকল ছিল আমি তা বের করে নিলাম। এর সাথে আরো একটি কাজ এই করলাম যে, যেসব লোকের কুরআন মুখস্ত ছিল তাঁদের ডেকে তাঁদের পাঠ পাথর ও বাকলে লেখা কুরআনের সাথে মিলিয়ে দেখলাম। এভাবে দুইটি উৎসের সাথে কুরআনের আয়াতগুলোর সামঞ্জস্য নির্ণীত হওয়ার পর তা একটি পুস্তক আকারে লিপিবদ্ধ করা হল।
হযরত যায়েদ ( রাঃ ) যে বলেছেন, সূরা তাওবার সর্বশেষ আয়াত আমি কেবল হযরত খুজাইমা ( রাঃ ) এর কাছে পেয়েছি— এর অর্থ এই নয় যে, এই আয়াত ঐ থলের পাণ্ডুলিপির মধ্যেই ছিল না। কেননা এই ব্যবস্থা করা হয়েছিলো যে, এই থলের মধ্যে যা কিছু পাওয়া যায় তা হাফেজদের মুখস্ত কুরআনের সাথে মিলানোর পরে লেখা হবে। অতএব তাঁর কথার অর্থ হচ্ছে এই যে, আমি কুরআনের যে কয়জন হাফেজ পেলাম, তাঁদের মধ্যে সূরা তাওবার এই শেষ আয়াত কেবল খুজাইমা আনসারীর ( রাঃ ) মুখস্ত ছিল। আমি থলের পাণ্ডুলিপির সাথে মিলানোর পর তা সংকলন করলাম।
মাসহাফে উসমানী কিভাবে প্রস্তুত করা হয়
আরবী***
৭৭। হযরত আনাস ইবনে মালেক ( রাঃ ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান ( রাঃ ) হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আসলেন। এটা সেই যুগের কথা যখন তিনি সিরিয় বাহিনীর সাথে আর্মেনিয়া বিজয়ে এবং ইরাক বাহিনীর সাথে আজারবাইজান বিজয়ে অংশ গ্রহন করেছিলেন। লোকদের বিভিন্ন রীতিতে কুরআন পাঠ হযরত হুজাইফাকে ( রাঃ ) উদ্বিগ্ন করে তুলল। তিনি হযরত উসমানকে ( রাঃ ) বললেন, হে আমিরুল মু’মিনীন, ইহুদী-খ্রিস্টানদের ন্যায় আল্লাহর কিতাবে বিভেদ সৃষ্টির পূর্বে আপনি এই জাতিকে রক্ষা করার চিন্তাভাবনা করুন।
অতএব, হযরত উসমান ( রাঃ ) হাফসাকে ( রাঃ ) বলে পাঠালেন, আপনার কাছে কুরআন শরীফের যে সহীফা ( অর্থাৎ মাসহাফে সিদ্দিকী ) রয়েছে তা আমাকে পাঠিয়ে দিন। আমরা এটা দেখে আরো কপি নকল করিয়ে দেব। অতপর মূল কপি আপনাকে ফেরত দেব। হযরত হাফসা ( রাঃ ) মাসহাফ খানা ( পুস্তকাকারে সংকলন ) হযরত উসমানের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। অতপর তিনি হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত আনসারী ( রাঃ ), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের ( রাঃ ), হযরত সাঈদ ইবনুল আস ( রাঃ ) এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হারিস ইবনে হিশাম ( রাঃ ) এই চার ব্যক্তিকে এ কাজে নিযুক্ত করলেন। তারা মাসহাফে সিদ্দিকী থেকে আরো কয়েকটি মাসহাফ তৈরি করবেন। উপরোক্ত এই চার ব্যক্তির মধ্যে কুরাইশ বংশের তিন ব্যক্তিকে ( হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের, হযরত সাঈদ ইবনুল আস এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হারিস ) তিনি নির্দেশ দিলেন, যদি কখনো কুরআনের কোন জিনিস নিয়ে তোমাদের সাথে যায়েদের মতবিরোধ দেখা দেয়, তাহলে তোমরা কুরআনকে কুরাইশদের বাক্যরীতি অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করবে। কেননা তা এই রীতিতে নাযিল হয়েছে। তারা তাই করলেন। যখন তারা পুস্তকাকারে কুরআনের নতুন সংকলন তৈরির কাজ শেষ করলেন হযরত উসমান ( রাঃ ) মাসহাফে সিদ্দিকী হযরত হাফসা ( রাঃ ) এর কাছে ফেরত পাঠালেন। তিনি কুরআনের এক একটি সংকলন ইসলামী খেলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি আরো নির্দেশ দিলেন, এই সংকলন ছাড়া আর যতো সংকলন রয়েছে তা যেন আগুনে জালিয়ে দেয়া হয়।
অধঃস্তন রাবী ইবনে শিহাব যুহরী বলেন, যায়েদ ইবনে সাবিতের পুত্র আমাকে বলেছেন, তিনি তাঁর পিতাকে বলতে শুনেছেন, আমরা যখন এই মাসহাফে উসমানী সংকলন করছিলাম তখন আমি সূরা আহযাবের একটি আয়াত খুঁজে পাচ্ছিলাম না যা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পড়তে শুনেছি। আমি এ আয়াতের খজে লেগে গেলাম। তা খুজাইমা ইবনে সাবিত আনসারী ( রাঃ ) এর কাছে পাওয়া গেলো। আয়াতটি হচ্ছে—“মিনাল মুমিনিনা রিজালুন সাদাকু মা আহাদুল্লাহ আলাইহি—– ”। অতএব আমরা তা এই মাসহাফে উল্লেখিত সূরায় সংযোজন করলাম। —– ( বুখারী )
হযরত হুজাইফাহ ইবনুল ইয়ামানের ( রাঃ ) শংকিত হওয়ার কারন ছিল এই যে, লোকদেরকে যেহেতু নিজ নিজ আঞ্চলিক রীতিতে কুরআন পাঠ করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল— এজন্য পরবর্তীকালে যখন বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হল এবং আরবের বিভিন্ন এলাকার লোকেরা এসে সেনাবাহিনীতে যোগদান করে বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করতে যায় সেখানে তাঁদের মধ্যে কুরআনের পাঠ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। এই অবস্থা দেখে হযরত হুজাইফাহ ইবনুল ইয়ামান ( রা; ) অস্থির হয়ে পড়েন। তিনি শংকিত অবস্থায় হযরত উসমান ( রাঃ ) এর দরবারে হাযির হন। তিনি তাঁকে বললেন, আপনি এই উম্মাতের কথা চিন্তা করুন। তা না হলে তাঁদের মধ্যে কুরআন নিয়ে এমন কঠিন মতবিরোধ সৃষ্টি হয়ে যাবে— যেরূপ তাওরাত ও ইঞ্জীল কিতাব নিয়ে পর্যায়ক্রমে ইহুদী এবং খ্রিষ্টানদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং হযরত উসমান ( রাঃ ) বিষয়টির নাজুকতাকে সামনে রেখে কুরআনের একটি নিখুঁত সংকলন তৈরি করার ব্যবস্থা করে দিলেন।
অতপর উসমান ( রাঃ ) এই সংকলনকে অবশিষ্ট রেখে বাকি সব সংকলন জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ এজন্য দিলেন যে, লোকেরা যখন লেখা ও পড়ার উপযুক্ত হয়ে গেল তখন তারা নিজ নিজ গোত্রের বাক্যরীতি অনুযায়ী কুরআন শরীফ লিখেও নিয়েছিল। তাঁদের এই সংকলনগুলো যদি পরবর্তীকালে সংরক্ষণ করা হতো তাহলে হযরত উসমানের তত্ত্বাবধানে তৈরিকৃত এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রেরিত সংকলনের সাথে বিরোধ দেখা দিত। বিভিন্ন রকমের সংশয়ের সৃষ্টি হতো। এজন্য যার যার কাছে লিখিত কুরআন বা তাঁর অংশ বিশেষ, এমনকি কোন আয়াত ছিল তাও তাঁদের কাছ থেকে ফেরত নিয়ে তা জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সাথে সাথে এই মর্মে সরকারী নির্দেশ জারি করা হয় যে, সরকারী তত্ত্বাবধানে কুরআনের যে সংকলন তৈরি করা হয়েছে, এটাই এখন আসল নোসখা হিসাবে গণ্য হবে। যে ব্যক্তি কুরআনের নিজস্ব কপি তৈরি করতে চায় সে এই সরকারী নোসখা দেখেই তা তৈরি করবে। এভাবে ভবিষ্যতের জন্য কুরআনের লেখন ও পঠন মাসহাফে উসমানীর উপর সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়।
যায়েদ ইবনে সাবিত ( রাঃ ) বলেছেন, সূরা আহযাবের একটি আয়াত আমি কেবল হযরত খুজাইমা আনসারীর ( রাঃ ) কাছে পেয়েছি। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা দরকার যে, হযরত আবু বকরের ( রাঃ ) যুগে যে মাসহাফ লেখা হয়েছিলো— মনে হয় এর কাগজ খুব শক্ত ছিল না। খুব সম্ভব ঐ আয়াতটি দুর্বল কাগজে লিপিবদ্ধ ছিল। মাসহাফে উসমানী নকল করার সময় পরিস্কার ভাবে তাঁর পাঠোদ্ধার করা যায় নি। তাই এ সম্পর্কে অনুসন্ধান করার প্রয়োজন দেখা দেয়। তাছাড়া আরো লক্ষ্য করার বিষয়, যায়েদ ইবনে সাবিতের যদিও স্মরণে ছিল যে, উল্লেখিত আয়াতটি সূরা আহযাবের নির্দিষ্ট স্থানে ছিল, কিন্তু তবুও তিনি এমন ব্যক্তির খোঁজ করার প্রয়োজন মনে করলেন যার এ আয়াত মুখস্ত আছে। তাতে পরিস্কারভাবে প্রমান হয়ে যাবে যে, এ আয়াতটি মূলত কুরআন মাজিদেরই অংশ। খোঁজ করতে গিয়ে তিনি এ আয়াতটি খুজাইমা আনসারীর কাছে পেয়ে গেলেন। অতএব তিনি তা লিখে নিলেন।
কুরআন শরীফ লিখন ও সংরক্ষণের ব্যাপারে সাহাবাদের কঠোর সতর্কতা অনুমান করুন। স্বয়ং যায়েদের ( রাঃ ) এ আয়াত মুখস্ত ছিল এবং তিনি নিজেই মাসহাফে সিদ্দিকীতে তা লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁর এও মনে আছে যে, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ আয়াত পাঠ করতে শুনেছেন। এতদসত্ত্বেও তিনি কেবল নিজের স্মৃতির উপর নির্ভর করে তা কুরআনের অন্তর্ভুক্ত করে নেননি— যতক্ষন অন্তত একজন সাক্ষী এর স্বপক্ষে পাওয়া না গেছে।
সূরা সমূহের ক্রমবিন্যাস রাসুলুল্লাহ ( সাঃ ) করেছেন
আরবী***
৭৮। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ( রাঃ ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হযরত উসমান ( রাঃ ) কে বললাম, কি ব্যাপার, আপনি যে সূরা আনফালকে সূরা তাওবার সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন? অথচ সূরা আনফালের আয়াত সংখ্যা হচ্ছে ৭৫ এবং সূরা তাওবার আয়াত সংখ্যা একশোর বেশী। ( আর যেসব সুরার আয়াত সংখ্যা শতের অধিক সেগুলো কুরআন শরীফের প্রথম দিকে রাখা হয়েছে। তাছাড়া আপনি এই সূরা দুটির মাঝখানে বিসমিল্লাহ লিখেননি। আপনি সূরা আনফালকে প্রথম দিককার বৃহৎ সাতটি সুরার অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছেন— এর কারন কি? অথচ এর আয়াত সংখ্যা একশোর কম। )
উসমান ( রাঃ ) জবাবে বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নীতি এই ছিল যে, লম্বা সূরা সমূহ নাযিল হওয়ার যুগে যখন তাঁর উপর কোন আয়াত নাযিল হতো তিনি তাঁর কোন কাতিবকে ডেকে বলতেন, যে সূরায় এই এই বিষয় আলোচিত হয়েছে তাঁর মধ্যে এই আয়াত লিখে রাখো। এভাবে যখন কোন আয়াত তাঁর উপর নাযিল হতো, তিনি বলতেন- এ আয়াতটি অমুক সূরায় সংযোজন করো যাতে এই এই বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। সূরা আনফালও মদিনায় প্রথম দিকে নাযিল হওয়া সূরা সমূহের অন্তর্ভুক্ত। ( বদরের যুদ্ধের পরে এই সূরা নাযিল হয় ) আর সূরা তাওবা মাদানী যুগের শেষ দিকে নাযিল হওয়া সূরা সমূহের অন্তর্ভুক্ত। এই সূরা দুটির বিষয়বস্তুর মধ্যে যদিও সামঞ্জস্য রয়েছে কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় আমাদেরকে পরিস্কারভাবে একথা বলেননি যে, সূরা আনফাল সূরা তাওবারই অংশ। এজন্য আমি এই সুরা দুটিকে পৃথক পৃথক এবং পাশাপাশি রেখেছি এবং এর মাঝখানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম লিখিনি। এটাকে আমি বৃহৎ সাতটি সুরার অন্তর্ভুক্ত করেছি। — ( মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযি, আবু দাউদ )
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ—“এই আয়াতকে অমুক সুরার অন্তর্ভুক্ত করো যার মধ্যে অমুক বিষয় আলোচিত হয়েছে”—- এতে প্রমান হচ্ছে যে, তিনি নিজেই সূরা সমূহের নামকরন করেছেন, তিনি বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে এর নামকরন করেননি। অথচ বিভিন্ন সুরার নাম কেবল ( সুরার ) নিদর্শন হিসাবেই রাখা হয়েছে। যেমন দ্বিতীয় সুরার নাম ‘আল বাকারা’—রাখার কারন এই নয় যে, তাতে গাভীর সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বরং এটা কেবল এজন্য রাখা হয়েছে যে, এই সুরার এক স্থানে গাভীর উল্লেখ আছে।
এ হাদীস থেকে দ্বিতীয় যে কথাটি জানা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় সূরাগুলোর ক্রমিক বিন্যাস করতে থেকেছেন। অপর একটি হাদীস থেকে জানা যায়, তিনি এও বলতেন—“এই আয়াতকে অমুক আয়াতের পূর্বে এবং অমুক আয়াতের পরে ( দুই আয়াতের মাঝখানে ) সংযোজন করো।” এভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগেই এক একটি সুরার ক্রমিক বিন্যাসও সম্পন্ন করা হয়েছিলো এবং তা পূর্ণাংগভাবে লিখেও রাখা হয়েছিলো। যখন নামাযে কুরআন মাজীদ পাঠ করা হতো তখন এর কোন ক্রমবিন্যাস ছাড়া তা পড়াও সম্ভব ছিল না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ক্রমিক ধারা অনুযায়ী বিভিন্ন সূরা লেখাতেন, সেও ক্রমিকতা অনুযায়ী তা পড়া হতো। আর সেই ক্রমধারা অনুযায়ী লোকেরা তা শুনত।
সূরা আনফাল এবং সূরা তাওবার মধ্যে পারস্পরিক সামঞ্জস্য রয়েছে। উভয় সুরার মধ্যেই জিহাদের আলোচনা হয়েছে। দুই সুরাই একই ধরনের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে। উভয় সূরায়ই কাফের ও মুনাফিকদের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। দুটি সুরাতেই জিহাদের বিধান বর্ণিত হয়েছে এবং আমাদেরকে জিহাদে যোগদান করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এভাবে বিষয়বস্তুর দিক থেকে দুইটি সুরার মাঝে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে।
এই সূরা দুটিকে পৃথক পৃথক ভাবেই রাখা হয়েছে। কিন্তু সূরাদ্বয়ের মাঝখানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম লিপিবদ্ধ করা হয় নি। এ ব্যাপারে হযরত উসমান ( রাঃ ) এর ভাষ্য হচ্ছে— বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে এই সূরা দুটিকে পরস্পর পাশাপাশি রাখা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা একই সূরায় পরিনত করা হয়নি। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় পরিস্কার ভাবে একথা বলেননি যে, এ দুটি একই সূরা, তাছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের লেখানো পাণ্ডুলিপিতে সূরা তাওবার প্রারম্ভে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লেখা পাওয়া যায় নি—এজন্য মাসহাফে উসমানীতেও তা লেখা হয় নি। বর্তমানেও আপনারা কুরআন শরীফ পাঠ করছেন— একটি সূরা শেষ করে অপর সূরা শুরু করছেন— কিন্তু এই সূরা দুটির মাঝখানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লেখা নাই। এ থেকে আপনারা অনুমান করতে পারেন সাহাবায়ে কেরাম কতটা দায়িত্ব নিয়ে কুরআন মাজীদ সংকলন করেছেন। যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে লেখানো পাণ্ডুলিপিতে যে সূরা তাওবা পাওয়া গেছে তাঁর সাথে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ নেই ( যেমন আমরা হাদীস থেকে জানতে পাই ) এ কারনে মাসহাফে উসমানীতেও এই সুরার সাথে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লেখা হয় নি।